১৯, আগস্ট, ২০১৯, সোমবার | | ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

কৃষককে বাঁচাতে হবে

‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা, দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা।’ রাজিয়া খাতুন চৌধুরানীর মতো এভাবে কৃষকের বন্দনা করেছেন অনেকেই। সাহিত্যে যেভাবে বন্দনা করা হয়েছে তার ছিটেফোঁটাও পড়েনি মুক্তিকামী এসব সাধকের বাস্তব জীবনে। দেশের সকল শ্রেনির মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসলেও ব্যতিক্রম শুধু এই কৃষকরা। যারা নিজেদেরকে পরিবর্তন নিয়ে খুব বেশী ভাবে না, নেই সুযোগও। এই শ্রেনির উন্নয়নে চিন্তা করেনা অন্য কেউও।

জীবনের সবটা সময় ধরে এরা মাটির সাথে মিশে থেকে দেশের মুক্তির জন্য, দেশের মানুষকে বাচানোর জন্য সাধনা করে যায়। কিন্তু বিনিময়ে পায়না অধিকারটুকুও। অন্য শ্রমিকরা কাজ করে মাসের শেষে ন্যায্য মাইনে না পেলে প্রতিবাদ করে, আন্দোলন গড়ে তুলে। কিন্তু কৃষকরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে ফসল ফলানোর পরও মূল্য না পেয়ে প্রতিবাদ করার সুযোগও পায়না। দাবি নিয়ে যেতে পারেনা কারো কাছে। কেউ নিজ থেকে উচু দালান হতে এসে এদের খোঁজও নেয়না। আর এভাবেই যুগের পর যুগ নিগ্রহের শিকার হয়ে আসছে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো।

সাম্প্রতিক সময়ে একটি আলোচিত ইস্যু ধান চাষে খরচের চেয়ে ধানের বিক্রয়মূল্য কম। নিজেদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম দিয়েও যেখানে এক মণ ধান চাষে খরচ হচ্ছে ৭৫০ টাকা সেখানে এর বিক্রয়মূল্য ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকা। এই সমীকরণের দিকে তাকালে অনেক প্রশ্ন সামনে আসে যেখানে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো, তাহলে কৃষক বাঁচবে কিভাবে?

প্রতি মণ ধান থেকে এর দুই তৃতীয়াংশ চাল উৎপাদন হয়। অর্থাৎ তিন মণ ধান থেকে উৎপাদিত হয় দুই মণ চাল। ১৫০০ টাকার ধান থেকে প্রস্তুত হচ্ছে ৩২০০ টাকার চাল। তাহলে ধান ও চালের মূল্যের মধ্যে এতো ব্যাবধান কেন? জবাব যদি হয় চালের প্রস্তুত প্রণালী, যেজন্য ধানের ক্রয়মূল্যের তুলনায় প্রস্তুত চালের মূল্য প্রায় দিগুণ। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় ফলন খরচের চেয়ে ফলিত ধানের বিক্রয়মূল্য বেশী নয় কেন? বা ধানের বিক্রয়মূল্যের থেকে এর উৎপাদন খরচ কম নয় কেন?

কৃষকের অনুর্বর মাথা এইসব প্রশ্নের জট খুলতে পারেনা। বরং এই প্রশ্নের উদয় হয় তাহলে কৃষক ধান চাষ করবে কেন? অর্থ ও শ্রম দিয়ে চাষ করে যদি লোকসান গুনতে হয় তাহলে এই চাষের দরকার কি? আর এই প্রশ্ন এখন শুধু কৃষকের মনে নয় প্রতিবাদের ভাষা হয়ে বেরিয়ে এসেছে বাইরে। তাইতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে কৃষকের প্রতিবাদী উক্তি ‘আর করবোনা ধান চাষ, দেখবো তোরা কি খাস’।

সন্তানের মতো সযতেœ বড় করা ফসলই এখন কৃষকের জন্য হয়ে উঠেছে গলার কাটা। যোগ বিয়োগের হিসাব মিলাতে না পেরে তাই মনের আগুনকে ছড়িয়ে দিচ্ছে পাকা ধান ক্ষেতে। গত কয়েকদিন আগে টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার এক কৃষক আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে ক্ষেতের পাকা ধান। এর একদিন পরই পাশের উপজেলার আরেক কৃষকও আগুন দেন ধান ক্ষেতে। এবারের বোরো মৌসুমে সারা দেশের চিত্র এটা। কৃষকের কান্না শোনার কেউ নেই। কৃষকের মনের এই আগুন নেভানোর যেন দায়ও নেই কারো। ধান ক্ষেতে এই আগুন দেওয়াকে একটি সাধারণ ঘটনা মনে করা যেতে পারেনা। এই আগুনে কৃষক শুধু তার ধানই পুড়ায়নি পুড়িয়েছে নিজেকে। নিজের দীর্ঘ দিনের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত করা পরিশ্রমকে এবং পরিবারের এক বছরের অন্নকে। একে সহজ ভাবে নেওয়া যেতে পারেনা। পাকা ফসল মাঠেই নষ্ট হলে আত্মহত্যা করা ছাড়া কৃষকের আর উপায় থাকবেনা বলেই মনে হচ্ছে। কৃষকের এই কান্না থামাতে না পারলে তারা চাষ থেকে বিমুখ হবে ফলে জাতি খ্বু দ্রুতই এর নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে পারবে।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। সরকার যদিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বোরো মৌসুমে এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১২ লাখ মেট্রিকটন ধান-চাল কিনবে কৃষক ও মিল মালিকদের কাছ থেকে। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত মূলত শুভঙ্করের ফাঁকি। কারণ সরকার ধান নয় কিনবে চাল। আর এই চাল কৃষকদের থেকে নয় কিনবে মিল মালিকদের থেকে। আর এই সুযোগেই সুবিধা ভোগ করছে কিছু মধ্যস্বত্বভোগীরা। অপরদিকে ধানের দাম না পেয়ে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক।

কৃষককে বাচাঁতে হলে ধান বাজারজাতের গুটা ব্যাবস্থাপনাতেই দরকার সরকারের নিয়ন্ত্রন। উৎপাদন খরচ কমাতে সেঁচ, সারসহ এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকিছু কৃষকের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে হবে। সেইসাথে অত্যধিক শ্রমিক মজুরী থেকে বাচাঁতে ধান কাটা, বস্তাবন্দি করা ও শুকানোর জন্য রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার, ড্রায়ারসহ আধুনিক যন্ত্রগুলো সহজলভ্য করতে পারলে এই সমস্যার কিছুটা উত্তোরণ হতে পারে।

মুনজুরুল ইসলাম নাহিদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।