৮, ডিসেম্বর, ২০১৯, রোববার | | ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

ওয়াসিব ইসলাম আসিফের গল্প “ছেলে আমার মস্ত বড় অফিসার”

আপডেট: মে ১৮, ২০১৯

ওয়াসিব ইসলাম আসিফের গল্প “ছেলে আমার মস্ত বড় অফিসার”

লেখকঃ ওয়াসিব ইসলাম ( আসিফ )

কোন একদিন আমি ও আমার বন্ধু মিলে কুরীগ্রামে বেড়াতে গেছিলাম। প্রায় চার পাঁচ দিন সেখানে অনেক আনন্দে কাটিয়ে ছিলাম। ষষ্ঠ দিনে দুজনে বাড়ির পথে রহনা দেই। দুজনে আশার সমায় কুরিগ্রাম বাস স্টান্ডে রংপুরের বাসে চরে রংপুর পর্যুন্ত আসলাম। তখন ঠিক বিকাল হয়ে গেছে। আমার বন্ধু আমাকে বললো চল তারাতারি সৈয়দপুরের বাসে চরি নাহলে যেতে যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে ওর কথা শুনে তারাতারি একটা গেটলক গাড়িতে উঠলাম।

উঠেই দেখি অনেক ভির তবে দুইটা সিট ফাকা রয়েছে সেখানেই বাসের কন্ট্রাক্টর আমাদের দুজনকে বসিয়ে দিলেন। আমার বন্ধু জানালার কাছে বসলো আর আমি ওর পাশে বসলাম। একটু যেতে না  যেতেই রংপুর মেডিকেল মোড়ে দার করালো মানুষ চরাবে বলে। ওখানে কিছুক্ষণ থাকতেই পুরো বাসটা ভর্তি হয়ে গেলো সিট তো ছিলো না সবাই দারিয়ে রইলো।

হঠাৎ আমি লক্ষ করলাম আমার সিটের পাশে এক বৃদ্ধ কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে দারিয়ে আছে। তাকে দেখেই টের পেয়েছিলাম তিনি বেশ ক্লান্ত ছিলো, জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতেছিলেন বলতে গেলে হাফাইতেছে। তখন আমি আমার সিট থেকে উঠে বৃদ্ধ মানুষটিকে বসতে বললাম তখন তিনি আমার সিটে বসলেন।

পিছন থেকে দু একজন বলতেছে দেখো নিজের সিটটা ফকির কে দিয়ে এখন দারিয়ে আছে আমি ওদের কথায় কান না দিয়ে বৃদ্ধ মানুষটাকে দাদা বলে সম্ধোন করলাম আর জিগ্যেস করলাম দাদা আপনি কোথায় গিয়েছিলেন।  তিনি জবাবে বললেন, শহরে ভিক্ষা করতে গেছিলাম বাবা, তখন বললাম এখন কোথায় যাবেন তিনি বললেন এখন পাগলাপির যাব ওখানে আমার বাড়ি। তাকে দেখে মনে মনে অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম।

কারন তার শরিলের যে অবস্থা সেই অবস্থাতে ভিক্ষা করাও অনেক কষ্টের। কুরীগ্রাম থেকে আশার সমায় বিস্কিট আর এক বোতল পানি নিয়েছিলাম খিদে লাগলে খাব বলে। ওগুলা বৃদ্ধ মানুষটাকে বের করে দিলাম আর বললাম দাদা বিস্কিট কয়েকটা খেয়ে পানি খান তাহলে ভালো লাগবে আলা। তখন তিনি দুটা বিস্কিট খেয়ে পানি খেয়ে নিলো তাকে বললাম সবগুলায় খান তখন তিনি বললেন বাড়িতে আমার। একটা নাতনি আছে তাকে দিব আলা। তখন আমি বললাম ঠিক আছে।

তখন তাকে আমার বন্ধু জিগ্যেস করলো,  দাদা আপনার কে কে আছে?  তিনি বললেন বাবা আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। তখন তাকে আমি বললাম দাদা আপনার ছেলেরা কি করে? তিনি বললেন অনেক কষ্ট করে মানুষের বাড়িতে কাজ করে বড় ছেলেটাকে লেখাপড়া করিয়েছে সে বিয়ে করে ঢাকায় বড় একটা কম্পানিতে চাকরী করে। সেটা শুনে একটু বিচলিত হয়েছিলাম তারপর বললাম দাদা আপনার আর একটা ছেলে কি করে তিনি বললেন ওকে পড়াশুনা করাতে পারি নাই তার বিয়ে হয়েছে মানুষের বাড়িতে কাজ করে খায় আর ছোট মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছে।এখন বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী আর ছোট ছেলেটা আলাদা খায় বউ বাচ্চা নিয়ে।

তখন তাকে বললাম আপনি আর দাদি আলাদা খান খরচ কিভাবে চালান? সেটা শুনে তার চোখ দিয়ে ঝড় ঝড় করে পানি বেরিয়ে আসতে লাগলো তিনি বললেন বড় ছেলে অনেক বড় অফিসার হয়েছে। অনেক খুশি হয়েছিলাম কারন সারাজীবন কষ্ট করে ওকে পড়াশুনা করাইছি যখন চাকরী পেয়েছে শুনে মনে একটু সস্তি এসেছিলো আর যাই হোক এবার একটু আমার কষ্ট দুর হবে। কিন্তু ভাগ্যের এমন দশা হবে সেটা কখনোই ভাবিনি।

চাকরী পেয়ে প্রথম কয়েকমাস টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলো যেই টাকা দিয়ে দুজন মানুষের সংসার চালাতে কোন সমস্যা হয় নাই বেশ সুখে ছিলাম। মাছ মাংস দিয়ে ভাত খেতাম। বলতে গেলে অনেক সুখে ছিলাম।

কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম ছেলে একটা মেয়েকে নিয়ে বাড়ি এসেছে ছেলকে জিগ্যেস করতেই বললো বাবা আমি বিয়ে করেছি, কথাটা শুনে প্রথমে রাগ হয়েছিলাম পরে ভাবলাম ছেলেকে তো বিয়ে দিতেই হতো সে নিজে করেছে তা ঠিক করেছে। ছেলে আর ছেলের বউ ১০ দিনের মত বাড়িতে ছিলো ১১দিনের দিনে ছেলে আমায় এসে বললো বাবা আমরা চলে যাইতেছি তখন বললাম বউমা কি যাবে?  বললো হ্যা বাবা ওখানেই থাকবে আমার সাথে তখন বললাম সাবধানে যেও বাবা।

সেই যে গেলো আর ফিরে এলো না ফোন দিলেও ফোন রিসিভ করে না। তখন কি করব ভেবে পাইতেছিলাম না ছোট ছেলের সামর্থ্য ছিলো না যে আমায় আর ওর মাকে দুবেলা দুমুঠো খেতে দিবে। পরে অনেক ভেবে দেখলাম এই বয়সে তো আর মানুষের বাড়িতে কাজ করতে পারব না। তাই তখন থেকে ভিক্ষা করতে শুরু করলাম প্রথম প্রথম একটু সরম লেগেছিলো কিন্তু পরে মানিয়ে নিয়েছি।

বাড়ির পাড়ার সবাই যখন বলে ছেলে বড় অফিসার আর বাবা মানুষের বাড়িতে ভিক্ষা করে বেরায় তখন সেই কথা শুনে চোখ দিয়ে ঝড় ঝড় করে পানি বের হয়। প্রতিদিন সকাল বেলা না খেয়ে মানুষের বাড়ি বাজার হেটে হেটে ভিক্ষা করে যে কয়টা টাকা পাই তা দিয়েই কোনমতে  সংসার চালাই।অনেক কষ্টে আছি বাবা এই বয়সে আর হাটতে পারি না একটুতেই হাফিয়ে পরি।

তিনি কথা গুলো বলতেছেন আর কাঁদতেছেন আমিও কেঁদে ফেলেছিলাম। তখন আমি আর আমার বন্ধু দুজনে মিলে তাকে কিছু টাকা দিয়েছিলাম। তিনি সর্বশেষে একটা কথা বলেছিলেন ” ছেলে আমার মস্ত বড় অফিসার ” আর আমি মানুষের দরজায় দরজায় ভিক্ষা করে খাই।ভাগ্য আজ আমায় ভিখারি বানিয়েছে বাবা। তার কথা শুনে অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। তার সাথে কথা বলতে বলতে পাগলাপির চলে আসলাস।তখন তিনি আমাদের বললেন বাবা বেঁচে থাকলে কখনো মাবাবাকে ফেলে দিবেন না। মাবাবার সকল দায়িত্ব নিবেন দেখবেন খোদা তোমাদের অনেক সুখে রাখবে। তখন আমরা বললাম ঠিকআছে দাদু,তখন তিনি বললেন আচ্ছা বাবা এবার যাই , সেখানে তিনি নেমে গেলেন।

একজন খুদে লেখক হিসেবে মনে করি আমরা যার কারনে পৃথীবীর আলো দেখেছি, লেখাপড়া শিখে ভালো চাকরী পেয়েছি আজ কিনা তাদের অবহেলার চোখে দেখতেছি। তাদের জায়গা আমাদের বাড়িতে হয় না তাদের জায়গা সরকারী বৃদ্ধাশ্রমে। আর কেউবা এই গল্পের বৃদ্ধের ছেলের মত যোগাযোগ বন্ধ করে রেখেছি।

একটাবার ভেবে দেখো যে মাবাবা কষ্ট করেরে তোমাকে লেখাপড়া শিখিয়ে ভালো চাকরী নিয়ে দিলো আর আমরা তাদের অবহেলা করতেছি বাড়িতে কাজের লোকের মত রাখতেছি।

যতদিন আমাদের সমাজে এরকম চলতে থাকবে ঠিক ততোদিনন হাজারো বাবা মা ভিক্ষা করবে নাহয় সরকারী বৃদ্ধাশ্রমে তাদের জীবন কাটিয়ে দিবে।

আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হই যে আমরা আমাদের পিতামাতাদের কখনো অবহেলার চোখে দেখব না। যতদিন তারা বেঁচে থাকবে ততোদিন তাদের জীবন চালানোর সব দায়িত্ব নিব…..!!