১৯, জানুয়ারী, ২০২০, রোববার | | ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

দেশ-বিদেশে সমাদৃত ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি

আপডেট: মে ১৯, ২০১৯

দেশ-বিদেশে সমাদৃত ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি

মুহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ, (ঝালকাঠি জেলা প্রতিনিধি): চলমান তীব্র গরমে অস্থির হয়ে একটু স্বস্তি ও শান্তির পরশ পেতে শীতল পাটিতে শয়নের যেন বিকল্প নেই। এ কারণে শীতল পাটির ক্রেতা বর্তমান গরম মৌসুমে যেমন বেড়ে গেছে, তেমনই পাটি তৈরীর কারিগরদের ব্যস্ততাও কয়েকগুণে বেড়েছে একই হারে, সমানতালে।  
ঝালকাঠি জেলার ঐতিহ্য এ শীতলপাটির বিশেষ কদর থাকায় দেশে বিদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়ে আসছে। তাই জেলার রাজাপুরের বেশ কয়েকটি গ্রামে ৮০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ৮ বছরের শিশুরাও নিপুন কারুতে ব্যস্ত সময় পার করছে এ মৌসুমে। 
পাটি শিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঝালকাঠির শীতলপাটি বহুকাল ধরে দেশ বিদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এখানকার চিকনবেতির শীতলপাটির চাহিদাও প্রচুর। এ অঞ্চলে অতিথিদের সামনে একটি ভালমানের শীতলপাটি বিছিয়ে নিজেদের আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়। পাটি শিল্প তাই বাংলাদেশের লোকাচারে জীবনঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক উপাদান। গরমের মৌসুমে এসব পাটি তাপে খুব বেশি গরম হয় না বলেই এটিকে শীতলপাটি বলা হয়।
কাঁচা মাল বা উপাদান হিসেবে পাইত্রা বা মোর্তা নামে এক ধরণের বর্ষজীবী উদ্ভিদের কাণ্ড থেকে বেতি তৈরি করা হয়। পরিপক্ক পাটি গাছ কেটে পানিতে ভিজিয়ে তার পর পাটির বেতি তোলা হয়। এরপর ভাতের মাড় ও পানি মিশিয়ে বেতি জ্বাল দেয়া হয়। এর ফলে বেতি হয়ে ওঠে মসৃণ ও সাদাটে। বেতির উপরের খোলস থেকে শীতলপাটি পরের অংশ তুলে বুকার পাটি এবং অবশিষ্ট অংশ ছোটার (চিকন দড়ি) কাজে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানে ঝালকাঠি জেলায় প্রায় তিনশ’রও বেশি পরিবার এ ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে, রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামে রয়েছে দুইশতাধিক পরিবার। এরা সবাই পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করেন। পুরাতন ঐতিহ্যের কারু হাতে গড়া শীতল পাটির জন্য এ গ্রাম দু’টিকে ‘শীতল পাটির’ গ্রামও বলা হয়। এ গ্রামের শত শত হেক্টর জমি জুড়ে রয়েছে বিশাল নজরকাড়া পাটিগাছের বাগান। এখানে শীতলপাটি, নামাযের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরনের পাটি তৈরি করা হয়। পাটির বুনন পদ্ধতি প্রধানত দুই ধরনের।
প্রথমত, পাটির জমিনে ‘জো’ তুলে তাতে রঙিন বেতি দিয়ে নকশা তুলে। দ্বিতীয়ত, পাটির জমিন তৈরি হলে তার চারপাশে অন্য রঙের বেতি দিয়ে মুড়ে দিয়ে। পারিবারিক ও উত্তারাধিকার সূত্রে পাটিকরদের পেশা এগিয়ে চলছে। শৈল্পিক উপস্থাপনায় এবং নির্মাণ কুশলতার কারণে দক্ষ ও সুনিপুন একজন পাটিয়াল নারীর কদরও রয়েছে সর্বত্র। একটি পাটি বুনতে ৩/৪ জনের দুই তিনদিন সময় লাগে। যা বিক্রি করে পাঁচশ থেকে দেড় হাজার টাকা আসে। মহাজনরা প্রতি পাটিতে একশ থেকে পাঁচশ টাকা লাভ করেন। পাইত্রা চাষ ও কেনার জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন হয়। এ জন্য শিল্পীরা মহাজন ও এনজিওদের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। এ শিল্পের সাথে জড়িতদের জীবন যাত্রার মানের উন্নতি হচ্ছে না।
 শীতলপাটি শিল্পীর জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় পুঁজির জন্য শিল্পীরা দাদন ব্যবসায়ী, সুদখোর মহাজনদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। তা ছাড়া বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত শীতলপাটি রপ্তানিযোগ্য পন্যের স্বীকৃতি পায়নি। এ কারণে এ ঐতিহ্য, শিল্প বিলুপ্তির পথে এগুচ্ছে দিন দিন। 
মঞ্জুরানী পাটিকর বলেন, ‘আমাদের তৈরি শীতলপাটি দেশ বিদেশে সমাদৃত। দেশের বিভিন্নস্থানে মেলা কিংবা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের অন্যকোন উপার্জন নেই। শুধু মাত্র শীতলপাটি বিক্রি করেই সংসারের খরচ এবং ছেলে-মেয়ের লেখা পড়া চালাই। তবে শীত মৌসুমে এবং বর্ষার সময় আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ প্রদান করতো, তা হলে বেশি পরিমানে পাইত্রা ক্রয় করে শীতলপাটি তৈরি করা সম্ভব হতো।’
স্থানীয় পাটি শিল্পী সমিতির সভাপতি বলাই চন্দ্র পাটিকর বলেন, ‘গরমে একটু প্রশান্তির জন্য যুগযুগ ধরে দেশের মানুষ শীতলপাটি ব্যবহার করে আসছে। সরকার হাইলাকাঠি গ্রামের পাটি শিল্পীদের সরকারিভাবে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই খাতের আওতায় ঋণ সহায়তা প্রদান করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ জন পাটি শিল্পীদেরকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ প্রদান করা হয়। তবে বিনা সুদে ঋণ বিতরণ করলে আমরা উপকৃত হবো।’
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক বলেন, ‘ঝালকাঠির শীতলপাটি দেশজুড়ে বিখ্যাত। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পাটি বিপনন ত্রুটি থাকায় বছরের একটা সময় তাদের বসে থাকতে হচ্ছে। আমরা সরকারের অতিদরিদ্র্য কর্মসৃজন কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র্য পাটিশিল্পীদের কাজের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। হয়তো এটা অচিরেই সম্ভব হবে।’
শাটিশিল্পীদের জন্য যেমন প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতা ও পণ্যটি রপ্তানি যোগ্য পন্যের স্বীকৃতি। শিল্পটিকে ধরে রাখতে, ঐতিহ্যটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের এগিয়ে এসে পাটিকরদের পাশে দাঁড়নো এখন সময়ের দাবি।