১৩, ডিসেম্বর, ২০১৯, শুক্রবার | | ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১

কাজে ফিরে যাবার আহবান খুলনার জেলা প্রশাসকের, শ্রমিক নেতাদের বৈঠক আজ

আপডেট: মে ১৯, ২০১৯

কাজে ফিরে যাবার আহবান খুলনার জেলা প্রশাসকের, শ্রমিক নেতাদের বৈঠক আজ

স্টাফ রিপোর্টার ঃ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের টানা আন্দোলনের ১৩তম দিনে গতকাল শনিবার খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন নতুন রাস্তায় গিয়ে শ্রমিকদেরকে সরকারের ম্যাসেজ পৌঁছে দিয়ে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর আহবান জানান। অচিরেই সব দাবি মেনে নেয়া হবে এবং যেহেতু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন সেহেতু শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক। তবে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবেন কি না সেটি নির্ধারণে আজ রোববার সকাল ১০টায় পাটকল শ্রমিক লীগ ও খুলনা-যশোর অঞ্চলের নয় পাটকলের সিবিএ-নন সিবিএ নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসছেন বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে। যদিও জেলা প্রশাসক গতকাল বিকেলে মঞ্চ ত্যাগ করার পরই শ্রমিকদের দাবির মুখে নেতারা ঘোষণা দেন যতই আশ্বাস দেয়া হোক মিলের হিসাবে টাকা না আনা পর্যন্ত কর্মবিরতি ও তিন ঘন্টার রাজপথ-রেলপথ চলবে। 
পাটখাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, বকেয়া মজুরী-বেতন পরিশোধ, মজুরী কমিশন কার্যকর ও প্রতি সপ্তাহের মজুরী প্রতি সপ্তাহে প্রদানসহ নয় দফা দাবিতে গত ৫ মে রোববার থেকে খুলনা-যশোর অঞ্চলের এবং ১৩ মে সোমবার থেকে সারাদেশের ২৬টি পাটকলের শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেন। এর মধ্যে দু’টি শুক্রবার থাকায় দু’দিন ছিল আন্দোলনের বাইরে। এছাড়া প্রতিদিনই সকাল ছয়টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কর্মবিরতি এবং কিছু পয়েন্টে রাজপথ-রেলপথ অবরোধ পালন করা হয়। প্রায় দু’সপ্তাহ আন্দোলন চললেও সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের সাথে সরাসরি আলোচনা এবং এটি একেবারে সাধারণ শ্রমিক পর্যায়ে এই প্রথম। যেটি গতকাল জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সম্মিলিতভাবে গিয়ে শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। 
গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জেলা প্রশাসক যান আন্দোলনরত শ্রমিকদের মাঝে। নগরীর নতুন রাস্তা মোড়ের সমাবেশস্থলে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার পাটকল শ্রমিকদের সকল বকেয়া মজুরী, বেতন ও জাতীয় মজুরী কমিশন মেনে নিয়েছে। আগামী দুই একদিনের মধ্যেই মজুরী ও বেতন পরিশোধ করার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মজুরী কমিশন বাস্তবায়ন হবে।
আপনারা রমজান মাসে আর কষ্ট না করে কর্মস্থলে ফিরে যান, আপনাদের ১২ থেকে ১৪ সপ্তাহের মজুরী প্রদান করা হবে। এজন্য খুলনা ও যশোর অঞ্চলের পাটকল শ্রমিকদের জন্য ৬০ কোটি টাকা বরাদ্ধ দিয়েছে সরকার। এ সপ্তাহের মধ্যে মজুরী কমিশন বাস্তবায়িত হবে। অপনাদের কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রী চিন্তা করে শ্রমিক-কর্মচারীদের সকল পাওনা পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর আগে একই ঘোষনা দেন বিভাগীয় শ্রম পরিচালক মোঃ মিজানুর রহমান। 
জেলা প্রশাসক ও শ্রম পরিচালকের এ ঘোষণার পর শ্রমিক নেতারা আজ রোববার সকালে বৈঠক করে পরবর্তী সিদ্ধান্তের কথা জানানোর কথা জানান। এরপর তারা সেখান থেকে ফিরে যাবার পর শ্রমিকরা আসর ও মাগরিবের নামাজ রাজপথে আদায় ছাড়াও প্রতিদিনের ন্যায় ইফতারী করেন রাস্তায়। জেলা প্রশাসক ও শ্রম পরিচালকের পাশাপাশি শ্রমিকদের মঞ্চে এসময় কেএমপির উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, চলামান কর্মবিরতির পাশাপাশি গতকাল বিকেলে খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, স্টার, খালিশপুর ও দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিকরা বিকাল ৪ টায় স্ব-স্ব মিল থেকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় খুলনা বিদ্যূৎ কেন্দ্রের একটি গাড়ি মিছিলের সামনে পড়ে। মিছিল কারীরা গাড়িটির সামনের ও পিছনের গ্লাস ভাংচুর করে। এ সময় গাড়ির চালক মোঃ সিদ্দকুর রহমান ও আঃ রহমান এবং আঃ সালামসহ খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩ কর্মচারী আহত হন। তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এছাড়া ট্যাংকলরী মোড়ে আরো ২/৩ টি মটরসাকেল ভাংচুর করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। একই কর্মসুচি আলিম ইষ্টার্ণ মিলের শ্রমিকরা আটরা শিল্প এলাকায় এবং কার্পেটিং, জেজেআই মিলের শ্রমিকরা রাজঘাটে রাজপথ-রেলপথ কর্মসুচি পালন পালন করে। 
সন্ধ্যায় আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ইফতারির আয়োজন করেন বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি খুলনার নেতা কর্মীরা। তারাও শ্রমিক মঞ্চে শ্রমিকদের আন্দোলনে একমত প্রকাশ করেন। ইফতারির পরে শ্রমিক সভায় সভাপতিত্ব করেন মোঃ মুরাদ হোসেন। 
সভায় বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিকলীগের সভাপতি সরদার মোতাহার হোসেন, মোঃ সোহরাব হোসেন, বেল্লাল মল্লিক, আঃ মান্নান, আবু দাউদ দ্বীন মোহাম্মদ, শেখ মোঃ ইব্রাহিম, আক্তার হোসেন, হেমায়েত হোসেন, মাওঃ হেমায়েত উদ্দিন আজাদী, দ্বী ইসলাম, খলিলুর রহমান, সেলিম আকন, সেলিম শিকদার, সরদার আলী আহমেদ, মিজানুর রহমান মানিক, গাজী মাসুম প্রমুখ। 
সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের মানব বন্ধন ঃ অপরদিকে, গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া মজুরী পরিশোধ, মজুরী কমিশন বাস্তবায়ন ও নয় দফা দাবিসহ রাষ্ট্রায়াত্ত মিলগুলোর আধুনিকায়নের দাবিতে সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের উদ্যোগে মানববন্ধন ও সামবেশ অনুষ্ঠিত হয়। 
মানব বন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক নাগরিকনেতা এ্যাড. কুদরত-ই-খুদা এবং পরিচালনা করেন নারীনেত্রী সুতপা বেদজ্ঞ ও উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম মহাসচিব আফজাল হোসেন রাজু। বক্তব্য রাখেন, সিপিবি’র জেলা সভাপতি ডাঃ মনোজ দাশ, ওয়ার্কার্স পার্টি জেলা সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. মিনা মিজানুর রহমান, পাট ও পাটশিল্প রক্ষা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও জাসদ মহানগর সাধারণ সম্পাদক মোঃ খালিদ হোসেন, সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস এ রশীদ, সিপিবি নগর সভাপতি এইচ এম শাহাদৎ, ওয়ার্কার্স পার্টি খুলনা জেলা কমিটির সম্পাদক ম-লীর সদস্য শেখ মফিদুল ইসলাম, বাসদ জেলা নেত্রী কোহিনুর আক্তার কণা, সাম্যবাদী দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক এফ এম ইকবাল, বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ-উজ-জামান, খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাড. নুরুল হাসান রুবা, ক্রিসেন্ট জুট মিল সিবিএ’র সভাপতি মুরাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন, খালিশপুর জুট মিল সিবিএ সভাপতি দীন মোহাম্মদ, প্লাটিনাম জুট মিলের সিবিএ সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান, বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক এ্যাড. আ ফ ম মহসীন, সুজনের মহানগর সভাপতি আলহাজ্ব লোকমান হাকিম, খুলনা নাগরিক ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক মিনা আজিজুর রহমান, সম্মিলিত খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মিজানুর রহমান বাবু, বৃহত্তর আমরা খুলনাবাসীর সভাপতি ডাঃ নাসির উদ্দিন, নাগরিক নেতা মনিরুল হক বাচ্চু, খুলনা উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন, উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মনিরুজ্জামান রহিম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাম্পাদক শরীফুল ইসলাম সেলিম, নিসচার জেলা সভাপতি মোঃ হাসিবুর রহমান হাসিব, নারী নেত্রী শামীমা সুলতানা শিলু, রসু আক্তার, সিলভী হারুন, আলমাস আরা, জেসমিন জামান, মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সমন্বয়কারী এ্যাড. মোমিনুল ইসলাম, বেলার জেলা সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল, সিডিপি’র বিভাগীয় সমন্বয়কারী এস এম ইকবাল হোসেন বিপ্লব, পরিবর্তনের নির্বাহী প্রধান নাজমুল আজম ডেবিট, ব্লাস্টের সমন্বয়কারী এ্যাড. অশোক কুমার সাহা 
প্রমুখ। 
বক্তারা বলেন, বর্তমানে খালিশপুরে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার অনাহারে। তারা চিকিৎসা বঞ্চিত, অভাবে সাড়ে চারশ’ এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী অর্থাভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারছে না। ছোট মুদি ব্যবসায়ীরা মানবিক কারণে ধারে মাল বিক্রি করে এখন নিঃস্ব। এসব মিলিয়ে খালিশপুর অঞ্চল এখন মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বক্তারা অবিলম্বে এ সকল সমস্যা সমাধানে ঈদের আগেই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন