৯, জুলাই, ২০২০, বৃহস্পতিবার | | ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪১

লা্ইলাতুল কদর ও ইতিকাফ

আপডেট: মে ২৬, ২০১৯

লা্ইলাতুল কদর ও ইতিকাফ

মো:তৌহিদুর রহমান তাহসিন,বিশেষ প্রতিবেদক:রমযান মাসেই আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের উপর সালাত, সিয়াম ও যাকাতের বিধান দিয়েছেন, আর মুসলমানদের এ মাসে এমন একটি রাত দিয়ে সম্মানিত করেছেন, যে রাতের মর্যাদা ৮৩ বছরের চেয়েও উত্তম। সেই রাতটিই হলো লাইলাতুল ক্বদর। রমযানের ফযীলত সকলেরই জানা, এর সওয়াব ও পুরস্কার অসীম। হযরত সালমান (রাঃ) থেকে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, শাবান মাসের শেষ দিবসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের উদ্দেশে ওয়াজ করেছিলেন, এ সময়ে তিনি বলেছিলেন, হে আমার সাহাবাগণ! তোমাদের কাছে এক মহান ও বরকতময় মাস সমাগত, যাতে রয়েছে এমনি এক রাত যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। আল্লাহ তা’আলা সে মাসের সিয়াম পালন ফরয এবং রাত্রি জাগরণ (তারাবীহ-এর নামায) সুন্নাত করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন নফল ইবাদত করবে, সে অন্যান্য মাসের ফরয আদায়কারীর সমান সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি এ মাসে কোন ফরয ইবাদত করবে, সে অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরয আদায়কারীর সমান সওয়াব পাবে। তারা (সাহাবাগণ) বললেন হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমাদের মধ্যে সবারই তো এমন কিছু (সামর্থ্য) নেই যা দিয়ে রোজাদারকে ইফতার করাব? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলা অনুরূপ সওয়াব সেই ব্যক্তিকেও প্রদান করবেন, যে ব্যক্তি শুধু এক পেয়ালা দুধ অথবা একটি খেজুর কিংবা সামান্য পরিমাণ পানি দিয়ে কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে। আর কোন ব্যক্তি যদি রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে আহার করায়, মহান আল্লাহ তাকে আমার হাউজে কাউসার থেকে এমন শরবত পান করাবেন যে, জান্নাতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত সে কখনও পিপাসার্ত হবে না। রমযান এমন মাস, যে মাসের প্রথমভাগে রয়েছে রহমত, মধ্যভাগে ক্ষমা আর শেষভাগে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি থেকে মুক্তিদানের সময়। আর রোজার মাসে যে ব্যক্তি (রোজা আদায়ের সুবিধার্থে) তার চাকরের শ্রম লাঘব করবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নামে অগ্নি থেকে মুক্তি দেবেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেছেন, আদম সন্তানের নেক আমলের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, কিন্তু সিয়াম পালনের প্রসঙ্গটি ব্যতিক্রম। আর অবশ্যই রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের সুঘ্রাণের চেয়েও পছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেছেন, জান্নাতে ‘রাইয়্যান’ নামক একটি দরজা আছে, কিয়ামত দিবসে সে দরজা দিয়ে শুধুমাত্র রোযাদাররাই প্রবেশ করবে, তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা সেই দরজার দিকে অগ্রসর হবেন, তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। রাসূল (সাঃ) তাঁর উম্মতকে রমযানের বৈশিষ্ট্য ও আদব সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সিয়াম ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিনে অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া বিবাদ না করে। তাকে যদি কেউ গালি দেয় অথবা তার সাথে বিবাদ করতে চায়, তখন সে যেন শুধু বলে দেয় যে, আমি রোজাদার (যে ঝগড়া ফাসাদ থেকে বিরত থাকবে) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেছেন, প্রত্যেক বস্তুর যাকাত আছে, আর শরীরের যাকাত হচ্ছে সিয়াম পালন, যে ব্যক্তি (রমযান মাসের রোজা রেখেও) মিথ্যা কথা, গীবত ও অন্যায় আচরণ বর্জন করেনি, তার পানাহার থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। আর যে ব্যক্তি মিথ্যা ও অনর্থক কথা বলা থেকে আপন জিহবাকে হেফাজত না করবে, হারাম থেকে স্বীয় দৃষ্টিকে না ফেরাবে, সে ইফতারও করেনি, রোযাও রাখেনি, বরং শুধু শুধু নিজ আত্মাকে ক্লান্ত করেছে বা কষ্ট দিয়েছে। পাঠকবৃন্দ, জেনে রাখুন অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসক এ ব্যাপারে একমত যে, সিয়াম পালন শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, আর অনেক জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা হয় এর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে উদর বা পাকস্থলীর বিশ্রাম হয়, ফলে উদর বা পাকস্থলীর শক্তি সঞ্চয় হয় ও ক্ষতিকর দ্রব্যাদি থেকে শরীর স্বস্তিলাভ করে আর ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো নির্মল হয় এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এই মাস কুরআন তিলাওয়াতের মাস, উন্নতমানের খানা পরিবেশনের মাস এবং গরীব, মিসকিন, ইয়াতিম ও বিধবাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের মাস। সিয়াম পালনের মাধ্যমেই মানুষ গরীব ও ক্ষুধার্তদের দুরবস্থা সম্পর্কে উত্তম শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। আমরা রমযান মাসের শেষ দশদিনে ই’তিকাফ করি। কেননা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমযানের শেষ দশদিন ই’তিকাফ করতেন, তার পরবর্তীতে তার স্ত্রীগণও ই’তিকাফ করতেন। আর রমযানের শেষ দশ রাতে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করার জন্য রাসূল (সাঃ) ই’তিকাফের গুরুত্ব দিয়েছেন বার বার, সে রাতে এই দু’আ বেশি বেশি পাঠ করার জন্য তাগীদ দিয়েছেন, ‘‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আ’ফুউন তুহিববুল আ’ফওয়া ফা’আফু আন্নি’ হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন, আর সে রজনীর মর্যাদা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। লাইলাতুল ক্বদরের বরকতে আমাদেরকে, আমাদের পিতামাতাসহ সকল মুসলমান নরনারীকে ক্ষমা করে দিন আমীন।

সুত্র:ইসলামিক গ্রন্থাবলি