১৮, সেপ্টেম্বর, ২০২০, শুক্রবার | | ৩০ মুহররম ১৪৪২

সেতু নির্মানে মাথা কাটা নিয়ে হুজুগে বাঙ্গালী

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৯

সেতু নির্মানে মাথা কাটা নিয়ে হুজুগে বাঙ্গালী

জি এম শরীফ মাছুম বিল্লাহচাঁদপুর প্রতিনিধি:
সেই ছোট কাল থেকেই শুনে আসছি ওই দুরে কোথাও বড় ব্রীজ বা সেতু নির্মান কাজ চলাবস্থায় হঠাৎ আর কাজ করতে পারছেনা। যা কিছু নদীতে পালানো হয় তাই নাকি তলিয়ে যাচ্ছে। এখন সেখান থেকে গায়েবি আওয়াজ আসতেছে মানুষে মাথা কেটে দিলে নাকি তারপর থেকে কাজ করতে পারবে। তাই সাবধান কোথাও একা একা যেতে পারবোনা। গেলেই নাকি ছেলে ধরারা নিয়ে যাবে। তখন কিছুটা বিশ্বাসও করতাম আবার ভয় লাগতো। সত্যি বলতে তখন যদি অপরিচিত কাউকে দেখতাম বা পাগল বেশে কাউকে দেখলেই দৌড়ে বাড়ি চলে আসতাম। না যানি এই বুঝি কেটে নিলো আমার মাথা। আবার বলতো বাড়িতে যারা আইসক্রিম বিক্রি করতে আসে, তারাও নাকি বাচ্চাদেরকে ধরে নিয়ে যায়। সে সময় মাঝে মাঝে আইসক্রিমও খাওয়া বন্ধ করে দিতাম। আসলে কি সত্যিই বিভিন্ন বড় ব্রীজ বা সেতু নির্মান করতে মানুষের মাথার প্রয়োজন হয়? নাকি আমরা শুধু হুজুগে বাঙ্গালীর মতো কান কথায় নাচতেছি। না গুজব আতঙ্কে ভয় পাচ্ছি? অথচ আজও পর্যন্ত কেউ কোন প্রমান করতে পারলোনা যে ওই এমন কোন এক নির্দিষ্ট সেতুতে সত্যিই মাথা কেটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সারা বছরেই মানব বা শিশু পাচার কারীরা কাজ করে, তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষদেরকে নিয়ে বিদেশ পাচার করে দেয়, বা অনেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে শিশু সন্তানদেরকে নিয়ে কোন দম্পতির হাতে তুলে দেয় যাদের কোন সন্তানাদি হয়না। আর দেশে যখন কোন বড় ব্রীজ বা সেতুর কাজ নির্মান করা হচ্ছে এবং মাথার জন্য নির্মান কাজ বন্ধ এমন গুজব চলছে ঠিক এ সময় যদি কোন শিশুকে নিয়ে গিয়ে পাচারকারীরা সন্তানাদি না হওয়া দম্পতির কাছে তুলে দেয়, তখন যদি আমরা ভাবি ছেলে ধরারাই আমাদের সন্তানকে নিয়ে তার মাথা কেটে দিয়েছে ওই সেতুতে। তাহলে আমাদের মতো মুর্খ্য জাতি আর কে হতে পারে?ছোট কালে আরো কয়েকটি গুজবের সম্মুখিন হয়েছি যেমন, অনেকেই বলতো যে- ওই কোন এক গ্রামের বাড়িতে এক মহিলা এসে পানি খেতে চেয়েছিলো। তখন বাড়িওয়ালা পানির জন্য ঘরের ভিতর ডুকলে পিছনে পিছনে ওই মহিলাও ঘরে ডুকে খাটের উপর উঠে এক কোনায় বসেছে। এর কিছুক্ষন পর থেকেই নাকি ওই মহিলার একটি লেজ বের হয়েছে। আর সেই লেজ শুধু বড়ই হতে চলছে। দুর দুরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসতেছে তা দেখার জন্য। তার লেজ নাকি শুধু বড়ই হচ্ছে আর সারা গ্রামে লেজ ছড়িয়ে পাড়ছে। তখন মনে মনে ভাবতাম আমরাও মনে হয় কিছুক্ষনের মধ্যে ওই লেজ দেখতে পাবো। আবার ভয়ও হতো যদি না ওই ধরনের মহিলা আবার আমাদের বাড়িতে চলে আছে। অথচ আজও পর্যন্ত এর কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। সেগুলো ছিলো ছোট বেলার কথা। তখনও গ্রামাঞ্চলের মানুষও শিক্ষিত ছিলো। তারা কেউ কেউ এগুলো বিশ্বাস না করলেও অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করতো এসব কান কথা। সে সময়তো তথ্য প্রযুক্তির এতো ব্যবহার ছিলোনা, তাই তখন বেশির ভাগই এধরনের কথা ছড়াতো ভিক্ষুক মহিলারা। কোন এক বাড়িতে এসে গ্রামের এক সহজ সরল মহিলার কাছে বললেই হলো, আর অমনিতেই ওই মহিলা ফোর জি নেটওয়ার্কের মতো পুরো বাড়ি ছড়িয়ে দিতো। তখনকার মা-চাচিরা ছিলো খুবই সহজ সরল মনের মানুষ, অল্পতেই মানুষকে বিশ্বাস করতো। ভাবতো ভিক্ষুকরাতো ভিক্ষা করার জন্য অনেক দুরে দুরে যায়, তাই হয়তো সে দেখে আসছে। তবে তখন এই সমস্ত গুজব সড়ানোর জন্য গ্রামের সহজ সরল অনেক মহিলাকেও দোষারপ করা হতো। বলছিলাম ১৮-২০ বছর পূর্বের কথা আমার অভিজ্ঞতা থেকে। তখন আমার বয়স ৭-৮ বছর। সেই সময়ের গুজব গল্প।তবে বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যুগেও যে মানুষ এতোটা গুজবে কান দিবে তা অকল্পনিয়। তবে মানুষও বা কি করবে বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি এমন ভাবে ছড়িয়ে পরছে যে দুষ্কৃতিকারীরা এমন ভাবে বিভিন্ন ছবির মধ্যে কাজ (ইডিটিং) করে তা প্রচার করে দয়ে বিশ্বাস না করেও যাবে কোথায়?ছোট কালে দাদা-দাদী বা বড় কারো কাছ থেকে শুনতাম আগের দিনে নাকি কিছু কিছু রোগ (বসন্ত, ডায়রীয়া, কলেরা ইত্যাদি) মাহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তো। এমনকি পুরো গ্রামের বহু মানুষ এসব রোগ আক্রান্ত হয়ে মারা যেতো। কিন্তু বর্তমানে দেখাযাচ্ছে যে, তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কিছু কিছু খবর এমন মাহমারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে যা খুবই বিপদ জনক, দেশ ও দেশের মানুষের জন্য।হ্যাঁ এতো কথা বলার একটাই কারণ বর্তমানে সবারই জানা যে, একটি গুজব মানুষকে এতোটা আতঙ্ক করেছে যা খুবই ভয়াবহ। সেটি হলো ‘পদ্মা সেতু নির্মান কাজে বাঁধা, লাগবে মানুষের মাথা। এ জন্য সারাদেশে বের হয়েছে ছেলে ধরা’। বিষয়টা মানুষের মাঝে এমন আতঙ্ক ছড়িয়েছে যার কারনে অপরিচিত কাউকে দেখলেই মারধর করা শুরু করে দেয়। যা খুবই অমানবিক। শারীরিক ও মানষিক প্রতিবন্ধি, দিন মজুর সহ কেহই যেন রেহাই পাচ্ছেনা এসব মারধর থেকে।সম্প্রতি গত কয়েকদিন ধরেই চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে ছেলে ধরা এমন গুজবে কয়েকজনকে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে বিভিন্ন থানা পুলিশ গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে ভোক্তভোগিদেরকে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে।বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও থানা সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের নারকেলতলা গ্রামের নোয়া বাড়ির সামনে ছেলেধরা সন্দেহে মাহমুদা বেগম (৬০) নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধাকে দেখে বাড়ির লোকজনের ডাকচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। এক পর্যায়ে তাকে লোকজন বেঁধে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেতে যেতে গণপিটুনি দেয় এবং ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। গণপিটুনির এক পর্যায়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল গণি বাবুল পাটওয়ারীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে। পরে তার কাছে থাকা জিনিসপত্র খুঁজে তার পরিচয় নিশ্চিত হয়। এই ঘটনায় পরবর্তীতে মারধরের ঘটনার সাথে জড়িত ৫জনকে আটক করেছে পুলিশ।চাঁদপুরে জেলার শাহরাস্তি পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাজিরকামতা গ্রামের বড় বাড়ি সংলগ্ন রাস্তার মাথায় অজ্ঞাত নারীকে ঘুরাফেরা করতে দেখে ওই নারীকে পদ্মাসেতুর গলাকাটা গ্রুপের সদস্য বলে আখ্যা দিলে হুজুগে লোকজন তাকে মারধর করে। পরে তাকে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর মোহাম্মদ মোল্লার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে থানা হেফাজতে নেয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চাঁদপুর শহরতলীর উত্তর ইচলী থেকে আবু খালেদ রতন (২১) (পিতা মোখলেছুর রহমান হাওলাদার উত্তর ইচলী) কে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশ জানায়, আটক আবু খালেদ রতন হাবাগুবা ও সিধে প্রকৃতির। তার এলোমেলো কথাবার্তা ও আচরণ দেখে তাকে আটক করে এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দেয়। পরে চাঁদপুর মডেল থানার এসআই আঃ মান্নান ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে। তবে পুলিশ বলছে, সে প্রতিবন্ধীর মতো।অপরদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চাঁদপুর রেলওয়ে কোর্টস্টেশন এলাকায় রঘুনাথপুর এলাকার শেখ বাড়ির সাখাওয়াত হোসেন (১২) একা বসে কাঁদছিলো। তার কান্না দেখে ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী লোকজন তাকে ছেলেধরা ব্যক্তিরা নিয়ে আসছে এমন আওয়াজ তুললে পুরো শপথ চত্বর এলাকাজুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়। মডেল থানার এসআই কামাল তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এঘটানাগুলো ছাড়াও চাঁদপুর জেলার আরো বহু জায়গায় এ ধরনের গুজবে বহু সাধারণ মানুষকেও মারধর করেছে।এদিকে এসমস্ত গুজবে বিশ্বাস করে চাঁদপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভিড় ঝমছে অভিভাবকদের। তারা তাদের সন্তানদেরকে স্কুলে নিয়ে আছে আবার ছুটি হলে বাসায় নিয়ে যায়। বর্তমানে এ পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।এছাড়াও ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার আশুগঞ্জ চরচারতলা গ্রামে একজন ডাব, নারিকেল গাছ পরিস্কার করা শ্রমিকের হাতে বস্তা, দা, দরি দেখে ছেলে ধরা/ মাথা কাটা সন্দেহ করে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলেছে। এর দায়বার নিবে কে? আপনাদের এই মিথ্যে, কুসংস্কার ও গুজবের কারনে কেড়ে নিতে পারে একটি মানুষের জীবন, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে একটি পরিবার, বন্ধ হয়ে যেতে পারে একটি পরিবারের আয়ের পথ। হারিয়ে যেতে পারে কোন বাবা মায়ের সন্তান, কোন মেয়ের স্বামী, কোন বোনের ভাই।এই সমস্ত ঘটনার জন্য ভয়ে এখন বহু গরীব খেটে খাওয়া মানুষ কাজের জন্য বের হচ্ছেনা। তাদের গায়ে কোন ভালো পোষাক থাকেনা, চুল এলোমেলা থাকে, কিছুটা পাগলের মতোই দেখতে। এ জন্য তারা ভাবে যদি আমাদেরকে ছেলে ধরা মনে করে মারধর করে, তাহলে কি হবে আমাদের অবস্থা। আর যদি পদ্মা সেতুর জন্যই মাথা লাগে তাহলে ঢাকা তালিমুল কোরআন হাসানিয়া কওমি মাদ্রাসার ছাত্র আল-আমিন (৮) কে কেন চাঁদপুর নিয়ে আসলো। তাকেতো পদ্মা সেতুর দিকেই নিয়ে যেতো।এ গুজবের ব্যাপার চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির বিপিএম পিপিএম এর নির্দেশে পুরো চাঁদপুরে সাইবার প্রেট্রলিং শুরু করেছে ডিবি, থানা পুলিশ এবং জেলা বিশেষ শাখা! ইতিমধ্যেই বেশকিছু ফেসবুক আইডি সনাক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলোকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে পুলিশ।যেকোনো ধরনের গুজব রটনাকারীর ব্যাপারে পুলিশকে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করে SP CHANDPUR এর অফিশিয়াল ফেসবুকে আহবান জানানো হয়েছে! গুজব সৃষ্টিকারীরা নাশকতা ও অস্থিরতা তৈরী করে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি তৈরী করতে চায়, এজন্যই এ সংক্রান্তে যেকোনো তথ্য ও ফেসবুক আইডি দ্রুত পুলিশের নজরে আনুন। মনে রাখবেন গুজবের শিকার হয়ে আপনি নিজেও বিপদে পড়তে পারেন।অপরদিকে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষও এ ধরনে গুজব বিশ্বাস না করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এ দিকে পদ্মা সেতুর কাজ সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে এমন নিউজ ১২ জুলাই শুক্রবারও বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয়। তাই এসব গুজবে কান দিবেননা।আসলে কথায় আছে ভালো খবরের চেয়ে খারাপ খবর দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছায়। ঠিক তেমনি এ ঘটনায়ও ঘটলো। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা, প্রশাসনের লোক যতই বলছে এগুলো মিথ্যে, গুজব। কিন্তু তাতে যেন অনেকেরই কানে যাচ্ছেনা।এ ধরনে গুজব কি মানুষ আনন্দ করার জন্য ছাড়ে নাকি দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করার জন্য ছাড়ে? যদি আনন্দ করার জন্যই এ সমস্ত গুজব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় আর তাতে অকারনেই ঝড়ে যায় কিছু মানুষের প্রাণ। কি লাভ হয় তাদের?আর যদি দেশে বিশৃঙ্খলা বা সরকারের উন্নয়ন মূলক কাজে বাঁধা দেওয়ার জন্য করে, হয়তো সামান্য কিছু দিন মানুষ সরকারকে দোষারপ করবে কিন্তু এক সময় এর সত্যতা বের হয়ে আসবেই। আর তখন আপনাদের অবস্থা কি হবে। যাই হোক এ ধরনের গুজব ও কুসংস্কার থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে।অনেক মুসলমানরাও বিশ্বাস করে ধমের বদল ধম দিলে বিপদ কেটে যায়। আসলে এ সংস্কৃতি হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। তারা অনেক মন্দিরে গিয়ে পাঁঠা (ছাগল) বলি দেয়। তাদের ধারনা এতে অনেক বিপদ কেটে যায়। আসলে যদি ধমের বদল ধম দেওয়াই যেতো তাহলে মানুষ কষ্ঠ হলেও প্রতি বছর দুই একটা পশু জবাই করে দিতো। আর এমন করে সে কেয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকতো। এগুলো সবই কুসংস্কার, এ ধরনের গুজব ও কুসংস্কার থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে। কুসংস্কার বা গোমরাহী হলে জাতি বা দেশ ধ্বংসের দিকে চলে যায়।