১, অক্টোবর, ২০২০, বৃহস্পতিবার | | ১৩ সফর ১৪৪২

অসুস্থ এক সমাজে আমাদের বসবাস!

আপডেট: জুলাই ২৪, ২০১৯

অসুস্থ এক সমাজে আমাদের বসবাস!

জি এম শরীফ মাছুম বিল্লাহ চাঁদপুর  প্রতিনিধি,
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে গত ২২ জুলাই সারাদেশে ২৭টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরে গণপিটুনিতে মারা গেছে ৪৩ জন। গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়নি এমন ঘটনা হয়ত আরও অনেক।মানুষ নিজের বাচ্চা নিয়ে বাইরে বের হতেও ভয় পাচ্ছে কারণ বাচ্চাটা যদি কান্নাকাটি শুরু করে তাহলেই বিপদ। অতি উৎসাহী জনতা যদি সন্দেহ করে বসে যে আপনি ছেলে ধরা বা গলাকাটা ওয়ালা তাহলেই শুরু হয়ে যাবে গণপিটুনি।কাঁধে একটা বস্তা, বস্তাটা একটু ফুলে আছে। ব্যাস, আপনি ছেলে ধরা। শুরু হবে গণপিটুনি। আপনার কথাবার্তা অসংলগ্ন, সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছেন, ব্যাস আপনি ছেলে ধরা। কোনো একটা বাচ্চাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছেন- বাবু, তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ো, বিস্কিট খাবে? আপনি আর ওখান থেকে ফিরে আসতে পারবেন না।এক কথায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে মানুষের মনে। সুন্দরবনে গেলেও মানুষের মনে এত ভয় তৈরি হবে না যতটা ভয় জনারণ্যে তৈরি হচ্ছে। কারণ মানুষগুলো পশুর চেয়ে হিংস্র আর নির্বোধ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন।কিন্তু প্রশ্ন হলো- কেন এমন হচ্ছে?
হুজুগ এবং গুজবের পেছনে প্রধান কারণ হলো সাধারণ মানুষের সীমাহীন অজ্ঞতা, যুক্তিহীন মনোভাব, চরম অন্ধত্ব। এগুলোর সাথে যখন হিংস্রতার যোগ হয়েছে তখন ঘটনা ঘটছে গণপিটুনির, এমনকি বহু মানুষ মারাও যাচ্ছে গণপিটুনিতে।মানুষের মধ্যে এগুলো একদিনে তৈরি হয় না। যখন কেউ জন্মগ্রহণ করে তখন কিন্তু সে পশুর মতোই একটা সাধারণ প্রাণী হিসাবে জন্মগ্রহণ করে। তাকে মানুষ বানানোর জন্য কিছু শিক্ষা দিতে হয়। শিক্ষার মধ্যে ত্রুটি থাকলে সে পরিপূর্ণ মানুষ হবে না, মানুষের সকল গুণ সে পাবে না।একটা উদাহরণ দিই-১ দিন বয়সের একটা বাঘের বাচ্চা আপনাকে আক্রমণ করবে না, আপনাকে হত্যা করতে পারবে না। এই বাচ্চাটাকে যদি তার বাবা-মা শিক্ষা দেয় তাহলে সে কিছুদিন বাদে হিংস্র হয়ে উঠবে এবং আপনাকে এক মিনিটেই হত্যা করতে পারবে। আবার ঠিক ঐ বাঘের বাচ্চাটাকেই যদি আপনি বাড়িতে এনে ফিডারে দুধ খাইয়ে, নিজ হাতে বিভিন্ন খাবার খাইয়ে বড় করতেন, শিকার ধরার শিক্ষা না দিয়ে আপনার সাথে খেলা করার শিক্ষা দিতেন তাহলে কিন্তু সে বন্য বাঘের মতো হিংস হতো না। এই যে পার্থক্য, এটা আসলে শিক্ষার পার্থক্য।মানুষ শিক্ষা পায় কোথা থেকে? পরিবার থেকে, খেলার সাথীদের কাছ থেকে, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে, সমাজ থেকে, শিক্ষকদের কাছ থেকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে, টেলিভিশন ও পত্রিকা থেকে, জুম’আর খুতবা থেকে, ওয়াজ-মাহফিল থেকে, সমাজে প্রচলিত সংস্কৃতি ইত্যাদি উৎস থেকে সমাজের মানুষগুলো শিক্ষা নিয়ে থাকে। যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে না তারাও কিন্তু উপরে বর্ণিত বিভিন্ন মাধ্যম থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। মানুষগুলো যেসকল উৎস থেকে শিক্ষা নিচ্ছে সেখানে কতটুকু যুক্তিবোধ, চিন্তাশীলতা, সচেতনতা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, আনুগত্য শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, মানুষের প্রতি সহনুভূতিশীল হতে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, নারীদের প্রতি সম্মানবোধ শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না।একজন চিন্তাশীল, যুক্তিবোধসম্পন্ন মানুষকে যদি বলা যায় যে, পদ্মা সেতুর জন্য সরকার মাথা সংগ্রহ করছে তাহলে সে কি সেটা বিশ্বাস করবে? নাকি প্রশ্ন করবে- মাথা দিয়ে কী হবে? নিজের বিবেকই তাকে উত্তর দিবে- এসব ফালতু কথা। যখন দেশের বিরাট একটা শ্রেণি এমন বাজে একটা গুজব বিশ্বাস করে ফেলে, যখন চাঁদে কাউকে দেখা যাচ্ছে- এমন গুজব বিশ্বাস করে ফেলে, যখন সাধারণ একটা নারীকে কেবলই সন্দেহের বশে পিটিয়ে হত্যা করে ফেলে তখন বুঝতে হবে বেশিরভাগ মানুষকে আমরা সঠিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি।