২৪, নভেম্বর, ২০২০, মঙ্গলবার | | ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ!

আপডেট: নভেম্বর ২৭, ২০১৮

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ!
মোঃ খোরশেদ আলম :বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে সঙ্গে  বাড়ছে প্রতিযোগিতা। কিন্তু বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু সহায়তা করছে, প্রশ্নটা থেকেই যায়।
উন্নত শিক্ষা ও প্রয়োগের মধ্য দিয়েই জাতি স্বনির্ভর জাতিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে  গ্র্যাজুয়েট বের হলেও তাদের মানের কমতি রয়েই যাচ্ছে!
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েকটি স্তর রয়েছে। উচ্চশিক্ষা হচ্ছে শেষ স্তর।  এই স্তরে শিক্ষার্থীদের কাজ হলো গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। পরবর্তী সময়ে মানবজাতির কল্যাণে সে জ্ঞানের বিস্তার ঘটানো। কিন্তু সে কাজ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকাংশে ব্যর্থ।
কারণও রয়েছে। যেমন গবেষণা স্বল্পতা, ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অসম অনুপাত, গবেষণা ও শিক্ষা খাতে অল্প বরাদ্দ। উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি শেষ হতেই সচেতন অভিভাবকরা সন্তানকে প্রথম সারির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য তোড়জোড় শুরু করেন।
উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই সন্তানকে নামকরা ভর্তি কোচিং সেন্টারে ভর্তি করান, যাতে তাদের সন্তানরা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়।
দেশের মোট শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে অধিকতর মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পায়। তাহলে এ কথা প্রমাণিত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাবীরা পড়ালেখা করে। মেধাবীদের লক্ষ্য থাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া। কিন্তু বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় কী শিখছে শিক্ষার্থীরা?
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কার্যক্রম সমপর্যায়ে হয়ে থাকে। কয়েকটি ধাপে চলে শিক্ষা কার্যক্রম। তার মধ্যে অ্যাসাইনমেন্ট, টিউটোরিয়াল ও ল্যাব থাকবেই। এই তিন প্রক্রিয়ায় চলে শিক্ষা কার্যক্রম।
স্বচ্ছতার দিক থেকে তিন প্রক্রিয়াতেই শিক্ষার্থীরা অন্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে  থাকে। একজনের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয় কয়েকজন। টিউটোরিয়াল ও ল্যাবে চলে নকলের ছড়াছড়ি।
কারণ হচ্ছে, তিন প্রক্রিয়ার মূল্যায়ন খুব কমই করেন শিক্ষকরা। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের মাঝে বইপড়ার বদলে শিট পড়ে পরীক্ষা দেওয়ার প্রথা তো রয়েছেই। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সমানভাবে দায়ী। কারণ শিক্ষার্থীরা বই পড়ে না, আর শিক্ষকরা যথাযথভাবে খাতার মূল্যায়ন করে না।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হ্রাস পাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে কেন ব্যর্থ হচ্ছে, তার কয়েকটি কারণ বলেছিলাম। তার মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া অন্যতম। মেধার বিপরীতে দলীয় বিবেচনা, ভিসিপন্থি নিয়োগ, স্বজনপ্রীতিসহ কিছু উপায়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
বঞ্চিত হচ্ছেন মেধাবীরা। যথার্থ পাঠগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ২০১৬ সালে ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর টিআইবির করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আটটি বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রভাষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ পদে নিয়োগে ৩ লাখ থেকে সর্বোচ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।
আর ১৩টির মধ্যে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ঘটানোর সুযোগ বিদ্যমান ছিল। তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়ালো। মেধাবী হলেই হবে না, নেতা ও টাকাওয়ালা হতে হবে।
বর্তমান সময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অবস্থা আরো নাজুক। প্রায়ই বিভিন্ন পত্রিকায় শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যের অডিও ফাঁসসহ টাকা লেনদেনের বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু কে করবে কার প্রতিকার! ফলে অদক্ষ আর যোগ্যতাহীন ব্যক্তিরাই জাতির মেরুদণ্ড তৈরির আসনে বসে যাচ্ছে।
তারপর যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো গবেষণা স্বল্পতা। উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, বিকাশ ও বিতরণ করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছে উচ্চশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ইউজিসির এক তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে দেশের মোট ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটিই গবেষণার পেছনে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি।আর কোনো গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি এমন বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১১টি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে গবেষণা খাতে তেমন উন্নতি হয়নি। যেমন এই অর্থবছরে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৭৪১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে গবেষণা মঞ্জুরি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা, যা অনুন্নয়ন বরাদ্দের শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ। এভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা একই।
শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে শিক্ষকরা যথার্থভাবে পাঠদানে ব্যর্থ হন। কারণ একটি বিভাগে চারটি সেশন থাকে। দেখা যায়, একই শিক্ষককে একাধিক সেশনের ক্লাস নিতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় দিতে ব্যর্থ হন। ২০১৫ সালে ইউজিসির করা এক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৩৬৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ১২ হাজার ৫৩১ জন। সে হিসাবে একজন শিক্ষককে সর্বোচ্চ ৬২ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গ্র্যাজুয়েট বের হলেও মানসম্মত গ্র্যাজুয়েটের অভাব থেকেই যাচ্ছে। তা না হলে সময়ের পরিক্রমায় দেশে বেকারত্বের হার কেন বাড়ছে। তার কারণ হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতিকে মানসম্মত গ্র্যাজুয়েট উপহার দিতে পারছে না।
লেখকঃ সহকারী ইংরেজি শিক্ষক
গুঞ্জর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা
মুরাদনগর, কুমিল্লা।