২৩, অক্টোবর, ২০১৯, বুধবার | | ২৩ সফর ১৪৪১

ইলিশ সম্পদ সংরক্ষনে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার কমতি নেই

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯

ইলিশ সম্পদ সংরক্ষনে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার কমতি নেই


চাঁদপুর প্রতিনিধি: বাংলাদেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার কোনো কমতি নেই। এই খাতে প্রতি বছর সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। প্রতি বছর অভয়াশ্রমের দু’মাস এবং মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময় ২২ দিন ইলিশ সম্পদ রক্ষা তথা জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচি নিয়েই প্রশাসনের মহাকর্মযজ্ঞ থাকে। বলতে গেলে এই সময়ে প্রশাসনের সকল সেক্টর এই কর্মযজ্ঞ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সফলতা আসছে না। প্রশাসন, মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাগণ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত সদস্য তথা পুলিশের পাশাপাশি নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ড ওই সময়গুলোতে বলতে গেলে ওই কাজেই ব্যস্ত থাকে। সকল সেক্টরের সমন্বয়ে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। দিন-রাত অভিযান চলে। কখনো পৃথক আবার কখনো টাস্কফোর্স অভিযান চালায়। কখনো কখনো তাদের দিন রাতই নদীতে থাকতে হয়। এতো কিছুর পরও সফলতা আসছে না। ওই নিষিদ্ধ সময়ে শত শত জেলে নদীতে নেমে নির্বিঘ্নে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করে। এই ধৃত জাটকা ও মা ইলিশ থেকেই প্রশাসন অভিযান চালিয়ে কিয়দংশ আটক করে। আর এই কিয়দংশের পরিমাণও শত শত মণ। একই সাথে অনেক জেলেও আটক হয়। তাদের জেল জরিমানা দেয়া হয়। কিন্তু এই আটক বা উদ্ধারের মাঝে কী কোনো সফলতা আছে? লক্ষ্য তো হচ্ছে জাটকা এবং মা ইলিশ নিধন না করা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জেলেরা যদি জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করেই ফেললো তাহলে সেই নিধনকৃত মাছ আটকের মধ্যে সফলতাই বা কী? প্রশ্ন হচ্ছে-প্রশাসনের এতো কঠোরতা এবং সরকারি এতো সহায়তার পরও জেলেরা কিসের বলে, কোন্ সাহসে এবং কাদের শেল্টারে নদীতে নামছে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেলো যে, সর্ষের মধ্যেই ভূত। আর এই অনুসন্ধানের আলোকেই কয়েকটি ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ জেলার চার উপজেলায় নিবন্ধিত মোট মৎস্যজীবী তথা জেলের সংখ্যা হচ্ছে ৫১ হাজার ১শ’ ৯০ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২১ হাজার ৫শ’ ৬৮ জন, হাইমচরে ১৫ হাজার ১শ’ ৪২ জন, মতলব উত্তরে ৮ হাজার ৮শ’ ৯৪ জন এবং মতলব দক্ষিণে ৫ হাজার ৫শ’ ৮৬ জন। জেলা মৎস্য অফিসে এটাই নিবন্ধনকৃত তথা কার্ডধারী জেলেদের সর্বশেষ সংখ্যা। এই ৫১ সহস্রাধিক জেলের জন্যই প্রতি বছর মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়গুলোতে থাকে সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তাসহ নানা সহযোগিতা। উল্লেখযোগ্য সহায়তা হচ্ছে, প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিল এ দু’মাস থাকে পদ্মা ও মেঘনা নদী থাকে মাছের জন্যে অভয়াশ্রম। এ সময়ে পদ্মা-মেঘনায় জাল নিয়ে নামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। আর এই অভয়াশ্রমকালীন কোনো জেলে যাতে নদীতে জাল নিয়ে না নামে সে জন্যে ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাস প্রতি জেলের জন্যে মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেয়া হয়। আর মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময় অক্টোবর মাসের ২২ দিনের জন্যে দেয়া হয় ২০ কেজি করে। এছাড়া ১৪ হাজার জেলে পরিবারকে বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে উপকরণ ছাগল ও সেলাই মেশিন দেয়া হয়। সেলাই মেশিন যাদের দেয়া হয়েছে এমন ৬ হাজার ৭শ’ ২০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
সরকারের এতোসব সহায়তা, সাহায্য ও উপকরণ প্রদান সবই জেলেদেরকে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত রাখার জন্যে। কিন্তু দেখা গেছে যে, এসব সহায়তা পেয়ে যেনো আরো শক্তি সঞ্চার করে দ্বিগুণ উদ্যমে জেলেরা নদীতে নেমে পড়ে নির্বিঘ্নে-নির্বিচারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করতে থাকে। এদিকে প্রশাসনেরও ব্যাপক প্রস্তুতি থাকে জেলেদের প্রতিরোধে। তারপরও দেখা যায়, নদীতে শত শত নৌকা নিয়ে জেলেরা মাছ ধরছে, নির্বিচারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করছে।
অভিযানকে তোয়াক্কা না করে জেলেদের এভাবে নদীতে নির্ভয়ে নেমে পড়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেলো ভয়াবহ তথ্য। বিশেষ করে চাঁদপুর সদরের বেশ কিছু জেলে এবং নদী পাড়ের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে জেলেদের মাছ ধরার সাথে চাঁদপুর নৌ পুলিশ এবং হরিণা ফাঁড়ির পুলিশ সরাসরি জড়িত। তাদের সাথে পুরাণবাজার ফাঁড়ি পুলিশেরও আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। তাদের প্রণোদনাতেই তখন জেলেরা নদীতে নামতে সাহস পায়। তারা জানান, অভয়াশ্রমের দুই মাস এবং মা ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে নৌ পুলিশ এবং হরিণা ফাঁড়ির পুলিশ টোকেন ব্যবহার করে জেলেদের নদীতে নামায়। আর নৌকার সাইজ অনুযায়ী টোকেনের হার হয়ে থাকে ২, ৩ ও ৫ হাজার টাকা করে। প্রতি নৌকা থেকে প্রতি টোকেন বাবদ এই টাকা নিয়ে থাকে নৌ পুলিশ ও ফাঁড়ি পুলিশ। আর টাস্কফোর্স বা প্রশাসনের অভিযান আসলেই এই পুলিশের মাধ্যমেই আগাম খবর চলে যায় নদীতে থাকা নৌকার মাঝিদের কাছে। তখন তারা নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। এখানেই শেষ নয়। আরো একটি গোপনীয় তথ্য হচ্ছে, নৌ-পুলিশ ও ফঁড়ির পুলিশ অভিযানকালে যে সব নৌ যান ব্যবহার করে থাকে, সেগুলোও জেলে নৌকা। আর এসব জেলে নৌকার লোকজনই নদীতে মাছ ধরার জন্য নেমে থাকে। সে জন্যে সহজেই তারা অভিযানের খবর জেনে যায়। তাই অভিযান তখন অনেকটা লোক দেখানো অভিযানে রূপ নেয়। তারপরও মাঝেমধ্যে অভিযানে যে জেলে আটক ও মাছ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে, সেসব অভিযান বিষয়ে ওই অপরাধপরায়ণ পুলিশ না জানার কারণে হয়ে থাকে। শুধু নৌ পুলিশ এবং হরিণা ফাঁড়ির পুলিশের বিরুদ্ধেই এ অভিযোগ নয়, পুরাণবাজার ফাঁড়ির পুলিশের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পুরাণবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ খুব বেশি। তিনি এই ফাঁড়িতে আছেন তিন বছরেরও বেশি সময় হয়। এতো দীর্ঘ সময় এক জায়গায় থাকায় অনেক অপরাধীর সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুরাণবাজার রামদাসদী, পুরাণ ফায়ার সার্ভিস, হরিসভা, রণাগোয়াল এলাকা, দোকানঘর ও বহরিয়া এলাকায় ওই নিষিদ্ধ সময়ে জাটকা এবং মা ইলিশের হাট বসে। এসব পুরাণবাজার পুলিশ ফাঁড়ির আশ্রয় প্রশ্রয়ে হয়ে থাকে বলে এলাকাবাসীর নিকট থেকে প্রচুর অভিযোগ পাওয়া যায়। আর চাঁদপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির নাকের ডগায় বড় স্টেশন মাদ্রাসা রোডস্থ লঞ্চঘাট টিলা বাড়ি এলাকায় নিষিদ্ধ সময়ে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করার মহোৎসব চলে। এ টিলাবাড়ি এলাকার প্রতিটি ঘর কারেন্ট জালে ঠাসা থাকে। অথচ নৌ পুলিশ থাকে নীরব। আর এই নীরবতা মাসোহারার বিনিময়ে।