১০, ডিসেম্বর, ২০১৯, মঙ্গলবার | | ১২ রবিউস সানি ১৪৪১

এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, মিলেমিশে চলছে ধর্মীয় আচার

আপডেট: অক্টোবর ৭, ২০১৯

এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, মিলেমিশে চলছে ধর্মীয় আচার

লালমনিরহাট প্রতিনিধি// লালমনিরহাট শহরে একই আঙিনায় রয়েছে একটি মসজিদ ও মন্দির। একই জায়গায় থাকা দুই ধর্মের দুই উপসনালয়ে শত বছর ধরে পারস্পারিক সহযোগিতায় চলছে ধর্মীয় আচার ও রীতি নীতি।

শহরের পুরান বাজারের কালীবাড়ি এলাকায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ ও মন্দিরের প্রাঙ্গণ একটি। সামনের খোলা জায়গাটিতে পূজা উপলক্ষ্যে যেমন মেলা বসেছে, তেমনি ওয়াজ মাহফিলসহ মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।
হানাহানি ও মতবিরোধ ছাড়াই শত বছর ধরে এভাবেই পারাস্পারিক সহযোগিতায় ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষরা। সম্প্রীতির এই স্থানটি দেখতে বিশেষ করে দূর্গাপূজার সময় দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা আসেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৩৬ সালে দুর্গামন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে সেখানে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুরান বাজার এলাকা অনেকের কাছে জায়গাটি কালীবাড়ি নামেই পরিচিত। এরপর মন্দির প্রাঙ্গনে ১৯০০ সালে একটি নামাজ ঘর নির্মিত হয়। এ নামাজ ঘরটিই পরবর্তীতে পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। এরপর থেকে কোন বিবাদ ও ঝামেলা ছাড়াই সম্প্রীতির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে আসছে দুই ধর্মের মানুষ।

কালীবাড়ী মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষক সনদ চন্দ্র সাহা জানান, প্রায় দেড়শত বছর আগে কালীমন্দির হিসেবে এ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যার কারনে এলাকাটির নামকরনও করা হয় কালীবাড়ী। বাজার গড়ে উঠলে বাজারের ব্যবসায়ী ও শহরের ধমপ্রাণ মুসলমানরা মন্দিরের পাশেই ফাঁকা জায়গায় একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। যা এখন পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে  প্রতিষ্ঠা পায়। সেই থেকে একটা উঠানে পাশাপাশি চলছে হিন্দু ও মসলিম দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়। এখানে মসজিদ মন্দির প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় সম্প্রীতির দিকদিয়ে লালমনিরহাট জেলবাসি এক অন্যান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যাহা দেশের কোথাও দেখা পাওয়া যাবেনা। এই মসজিদ মন্দির প্রমান করে ধর্ম যার যার উৎসব সবার। তিনি আরো জানান, পূজা শুরু আগে মসজিদ ও মন্দির কমিটি বসে সিদ্ধান্ত  গ্রহন করেন। সিদ্ধান্ত মতে, আযানের সময় থেকে প্রথম জামায়াত নামাজ পর্যন্ত মন্দিরের মাইক, ঢাক ঢোলসহ যাবতীয় শব্দ যন্ত্র সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকে। ওই সময় পুরোহীত নিরবে পূজা করবেন ঢাক ঢোল ছাড়াই। নামাজের প্রথম জামায়াত শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঢাক ঢোল পিটিয়ে ও বাদ্য যন্ত্র এবং মাইক বাজিয়ে শুরু হয়ে যায় পুজা অর্চনার কাজ। যুগের পর যুগ ধরে একই নিয়মে চলছে মসজিদ ও মন্দিরের কার্য়ক্রম। এখানে  সামান্য তম বিশৃঙ্খলা কোনদিন হয়নি। মন্দিরের কার্যক্রম ভালভাবে চলাতে মুসলিমরা সবসময় সকল ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে। ইতিহাস স্বাক্ষ দেয় বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কারনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে ছিল। কিন্তু লালমনিরহাটের কালীবাড়িতে তার আগুনের আচ কোনদিন পড়েনি। দেশের কোথাও হিন্দুদের উপর আক্রমন হলে ধর্মী উগ্রবাদিরা সুবিধা নিতে মন্দিরে যদি হামলা করে। তাই কোথাও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মুসলমানরা মন্দির দিনরাত্রি পাহাড়ার ব্যবস্থা করে থাকে। এভাবে শতশত বছর ধরে মসজিদ মন্দিরটি পাশাপাশি চলছে। স্বাধীনভাবে দুই ধর্মের মানুষ এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করছে।

পুরান বাজার জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফজল মিয়া জানান, ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি এক জ্বলন্ত  প্রমাণ। যুগ যুগ ধরে একই উঠানে চলছে নামাজ ও পূজা অর্চনা। নামাজের সময় মন্দিরের ঢাক ঢোল বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে মন্দিরে পুজা চলে পুরোদমে। আযান ও নামাজে তো খুব বেশী সময় লাগে না। এ সময় টুকু তারা(পুজারী) ঢাক ঢোলসহ শব্দযন্ত্র বন্ধ রাখেন। কোন ধরনে বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এ সম্প্রীতির বন্ধনে ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন বলে দাবী করেন তিনি। এক সময় ছিল ভারত বর্ষের রেল যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু লালমনিরহাট। লালমনিরহাট ছিল রেলওয়ে কেন্দ্রীক শহর। ব্যবসা বানিজ্য ছিল জমজমাট। তখন শহরের কালীবাড়িতে হিন্দু মাড়োযারীরা ব্যবসা বানিজ্য পরিচালিত করতো। তারাই এখানে ধর্মীয় আচার পালন করতে কালীমন্দির স্থাপন করেন। পরবর্তীতে সেই মন্দিরটিতে প্রত্যহ সন্ধ্যায় পুজা অর্চনা হয়ে আসছে। শতবছর ধরে প্রতিবছর এখানে এই মন্দিরে দূগাপুজাও হয়ে আসছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাড়োযারীরা ভারতে চলে যায়। ব্যবসা বানিজ্য মুসলমানেরা শুরু করে। তারা ধর্মীয় আচার পালন করতে মন্দিরটি অক্ষত রেখে মসজিদ নির্মান করেন। শত বছর ধরে একদিনের জন্য এখানে নামাজ ও পুজা বন্ধ হয়নি। ধর্মীয় এই সম্প্রীতি দেখতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা এই মসজিদ মন্দির পরিদর্শন করে গেছেন। এমন কি আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মদিনা এই মসজিদ মন্দির পরিদর্শন করেছেন।  
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ এ জেলার মানুষ। ধর্ম যার যার উৎসব সবার এটাই এখানকার মানুষ লালন করে ও বিশ্বাস করে। যার মুর্ত প্রতীক এক উঠানে কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী মন্দির ও পুরান বাজার জামে মসজিদ।