২৮, নভেম্বর, ২০২০, শনিবার | | ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

দুমকিতে আগ্রহ হাড়াচ্ছে পান চাষীরা

আপডেট: ডিসেম্বর ৫, ২০১৯

দুমকিতে আগ্রহ হাড়াচ্ছে পান চাষীরা


সোহাগ হোসেন দুমকি (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি\ পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলাসহ দক্ষিনাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তণের বিরুপ প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও আর্থিক যোগান সংকটের কারণে দিন দিন পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে চাষীরা।

উপক‚লীয় জেলা পটুয়াখালীর দুমকিসহ বিভিন্ন উপজেলায় পান চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও দিন দিন কমে যাচ্ছে পানের বরজ। পান চাষীরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তণের বিরুপ প্রভাবে প্রতি বছরের অনা-বৃষ্টি, অতি বৃষ্টি, ঘূর্ণীঝড়, জলোচ্ছাসের ক্ষয়-ক্ষতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক যোগান সংকটের কারণে পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে চাষীরা। চলতি বছরে ঘূর্ণীঝড় ‘বুলবুল’ তান্ডবে পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পথে বসতে হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ চাষীরা বলছেন, ধার-দেনায় গড়ে তোলা পানের বরজ বিধ্বস্থ হওয়ায় দু’এক জন চাষী তার বরজ ঠিক করলেও বেশীর ভাগ চাষীর বরজ নস্ট হয়ে যাচ্ছে। টাকার অভাবে তারা পুন:রায় ঠিক করতে পারছেন না। আর্থিক যোগান কিম্বা সাহায্য-সহায়তা পেলে সম্ভাবনাময় পান চাষে আগ্রহী হবেন তারা।

উপজেলার পান চাষীরা জানান, কৃষি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা না থাকায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। এছাড়া উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও প্রকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদেরকে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় সু-স্বাদু পান চাষে অনীহা প্রকাশ করছেন চাষীরা। উপজেলার পাঙ্গাশিয়া ও আঙ্গারিয়া এবং মুরাদিয়া ইউনিয়নের অধশতাধিক পরিবার বর্তমানে পান চাষে জড়িত রয়েছে। এ পান স্থানীয়দের কাছে খুবই প্রিয়। জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখতে পারে ভ‚মিকা। এক সময় প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে পানের বরজ থাকলেও এখন তা অনেকটা কমে এসেছে। প‚র্ব পুরুষের পেশা হিসেবে এখনো যারা পানের বরজ নিয়ে আছেন তারা জানান, পান চাষের জন্য সরকারি কোন সাহায্য সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ঝড়-জলোচ্ছ¡াসে যে কোন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার তাদের সহায়তা করে কিন্তু পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে চাষীদের পাশে কেউ দাঁড়ায় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বহু আগ থেকে দুমকিতে কিছু পান চাষী স্থানীয়ভাবে পান চাষ করে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন। পরে পাঙ্গাশিয়া, আঙ্গারিয়া,মুরাদিয়া,লেবুখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে পান চাষে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পর্যায়ক্রমে ওই এলাকার চাষীরা পান চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং সফলতার মুখও দেখেন। বর্তমানে চাষীরা কৃষি বিভাগের পরামর্শ না থাকায় পান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

আংগারিয়া ইউনিয়নের জলিশা গ্রামের পান চাষীরা হরিপদ চান হাওলাদার জানান, রোগবালাই পান উৎপাদনের একটি প্রধান অন্তরায়। পানে গোড়া পঁচা, ঢলে পড়া, পাতা পঁচা, অ্যানথ্যাকনোজ ও সাদা গুঁড়া ইত্যাদি রোগ দেখা যায়। এর মধ্যে পঁচন ধরা পানের জন্য একটি মারাত্মক রোগ। গাছের যে কোনো বয়সে এ রোগ হতে পারে। পানের বরজে সাধারণত কার্তিক ও অগ্রহয়ান মাসে এ রোগের প্রকোপ মহামারী আকারে দেখা দেয়। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে গাছের গোড়ায় আক্রমণ করে। গোড়ায় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মাটির কাছের একটি বা দুটি পবের মধ্যে কালো বর্ণ ধারণ করেছে। উপরে লতা-পাতা হলুদ হয়ে যায় ও ঝরে পড়ে। মাটি সংলগ্ন লতার ওপর সাদা সুতার মতো ছত্রাক মাইসেলিয়া দেখা যায়। পরে হালকা বাদামি থেকে বাদামি সরিষার ন্যায় এক প্রকার অসংখ্য দানার মতো স্কেরোসিয়া দেখা যায়। মাটি সংলগ্ন ডাঁটা পঁচে যায় এবং গাছ ঢলে পড়ে মরে যায়। পানের রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ফলন অনেকাংশে বৃদ্ধি পেত।

পান চাষী নিরঞ্জণ মন্ডলের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, পানের বরজ তৈরি করে লতা লাগিয়ে ভাল ফলন পেলেও সার কিটনাশক ব্যবহারে পানের রোগ ঠেকাতে পারছেন না তারা। রোগবালাই কিংবা সমস্যা দেখা দিলে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা কিংবা ঔষধ বিক্রেতাদের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা গ্রহন করেন। তখন কৃষি বিভাগ থেকে কোন পরামর্শ পায়না চাষীরা। তাই পানের বরজ বাদ দিয়ে অন্য ফসল ফলানোর দিকে ঝুকেঁ পড়ছে পান চাষীরা। পান চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন সার, খৈল, বরজ তৈরির বাঁশ ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের মজুরির হার বাড়লেও সেই তুলনায় পানের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এতে পান চাষীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একসময় এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পান চাষ হতো। এই পান এলাকার বাজার গুলোর চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশে রপ্তানী হত। কিন্তু নানাবিধ সমস্যায় পানের চাষ দিন দিন কমে যাচ্ছে।

স্থানীয় চাষী অরুনী রানী জানান, সরকার কৃষকদের জন্য সারা দেশে বিনাম‚ল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক বিতরণ করলেও দুমকিতে পান চাষীদের কপালে সার-বীজ ও এক বোতল কীটনাশকও জোটেনা। অঙ্গারিয়া ইউনিয়নে একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকলেও কোনো দিন তাকে পানের ক্ষেতে দেখা পাইনি। কৃষি উন্নয়নে নিয়োজিত এই কর্মকর্তারা যদি পান চাষে প্রশিক্ষন ও সহায়তা দিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করতেন তাহলে চাষীরা আগ্রহ হারাতো না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিসেস মেহের মালিকা জানান, পান চাষের উপর কৃষি বিভাগের কোন কার্যক্রম নেই। তবে চাষীদেরকে আমরা বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে থাকি। এছাড়াও চাষীদের মধ্যে পান চাষে অগ্রহ ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করবো।