২২, অক্টোবর, ২০২০, বৃহস্পতিবার | | ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

চাঁদরাত ও সময়ের লুকোচুরি

আপডেট: মে ২৪, ২০২০

চাঁদরাত ও সময়ের লুকোচুরি



কবি ও লেখক: এম. এ. সিদ্দিকী বাপ্পী : হাফপ্যান্ট পড়ে নদীর দিকে ছুটছে দিবস। তার পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে আদরের বুলু। নামটা ব্লু থেকে অপভ্রংশ হয়ে বুলু হয়েছে। গ্রামের মানুষের মুখের উচ্চারণ বলে কথা। একটু দৌড়েই ভীষণ হাঁপাচ্ছে দিবস। খুব তেষ্টা পেয়েছে কিন্তু মটকা কাছে নাই বলে পানি খেতে পারবে না। ছোটদের জন্য প্রচলিত উদ্ভট এক নিয়ম মটকাতে রোজা রেখে খাবার খাওয়া। দিবস মটকাতে রোজা রাখে শুধু পানি খাবার জন্য। নিজে পানি খেলেও তার প্রিয় বুলুকে যত্ন সহকারেই পেট পুরে খাওয়ায়। তিন মাসের কিউট কুকুরছানাই দিবসের বুলু। রোজ নদীর ঘাটে নিয়ে স্নান করায়। আজও বেশ সুন্দর করে স্নান করিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। নদীতে কুড়িয়ে পাওয়া চিরুনি দিয়ে লোমগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে দিচ্ছে আর বলছে, “বন্ধু, আজকে কিন্তু তোমাকে সুন্দর হয়ে থাকতে হবে। মা বলেছে, মেজো কাকা, সেজো কাকা, ছোট কাকা আর খুখু মনি আসবে। খুখু মনি হল আমার একমাত্র ফুফু। সাথে আসবে বড় আপা, ছোট আপা আর ফুফাতো ভাই। ফুফাতো ভাইয়ের নাম কণ্ঠ। সেও তোমার মতই আমার আরেকটা বন্ধু। তারা সবাই যেন তোমাকে দেখে খুশি হয়, ওকে? আমিও আজকে ভালো জামাকাপড় পড়বো। রাতে সবাই মিলে মেহেদী দেবো, চাঁদ দেখবো আর লুকোচুরি খেলবো। রাগ করো না আবার, তুমিও আমাদের সাথে খেলবে। কাকা তারা বিকেলের লঞ্চে এসে নামবে। আমার জন্য নতুন জামাকাপড় আনবে। আমি আর তুমি এখন বাড়ি গিয়ে রেডি হয়ে খুখু মনিদের আনতে যাবো।” চোখেমুখে খুশির অদ্ভুত এক আমেজ নিয়ে কথাগুলো বলছে দিবস। বুলুকে তার স্নান করানো শেষ। গত ইদের আগেরদিন, দিবস একা একাই খুখু মনিদের রিসিভ করতে  গিয়েছিল। কণ্ঠ গতবার অনেকগুলো আতশবাজি এনেছিল। এইবার হয়ত আরও মজার কিছু নিয়ে আসবে। ইদ শেষ হয়ে যাবে বলে কাকার দেওয়া সাদা রঙের চকমকে ফতুয়া আর প্যান্ট ইদের দিন সকালের আগে বের করেনি দিবস। এবছর হয়ত আরও সুন্দর একটা জামায় ইদ হবে দিবসের। কিন্তু বুলুর জন্য তার চোখেমুখে একটা কষ্ট। কাকা যদি জানতো তার বুলু নামের বন্ধু হয়েছে নিশ্চয় তার জন্যও জামা আনতো! 

নদী থেকে বাড়িতে ফিরেই দিবস আর বুলু রাস্তার দিকে খুখু মনিদের প্রতিক্ষায় আছে। খানিক বাদেই বেল বাজিয়ে দুটো রিক্সা এসে থামলো তাদের বাড়ির রাস্তায়। দিবস দৌড়ে বাড়ি এসে সবাইকে বলছে, “খুখু মনিরা চলে আসছে।” খুখু মনিদের বাড়িতে রেখে, কণ্ঠ আর দিবস লঞ্চঘাটে দৌড়; তাদের সঙ্গী আদরের বুলুও। বুলুকে কণ্ঠ’র খুব পছন্দ হয়েছে। তারা নদীর তীরে মাটির হাড়ির ভাঙা অংশ দিয়ে ব্যাঙ লাফ খেলছে। কানে ঝড়ের বেগে এসে পৌঁছালো লঞ্চের সাইরেন। লঞ্চ ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে আসছে আর বুকের ভেতর ইদের আমেজ বাড়ছে, বেড়েই চলেছে। লঞ্চ ঘাটে আসলো। একে একে সবাই নামছে। প্রিয়জনকে দেখে সবার উৎসুক চোখে খুশির জোয়ার। লঞ্চের বিদায়ী সাইরেন বাজলো কিন্তু সেবার দিবসের কোন কাকাই লঞ্চ থেকে নামেনি। একবুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা তিনজন। দিবসকে দেখে খুশির হাসি হেসে দাদী বলে, “তোর কাকারা কই?” দিবস হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। দাদী সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “দেখবি সন্ধ্যাবেলার ট্রলারে তোর কাকারা আসবে।” সন্ধ্যা মিলিয়ে গভীর রাত রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে দিবস। তার কাকারা সে ইদে ফেরেনি। 

ইদের দিন বিকাল। মন খারাপ করে বারান্দায় বসে আছে দিবস। বুলু ক্ষুধায় ছটফট করছে, সেদিকে খেয়াল নেই তার। বুলু ঘেউঘেউ করতেই দিবস তাকালো। চোখ ঘুরিয়েই কেঁদে ফেললো বেচারা। কাঁদে না বলে সান্ত্বনা দিয়ে ঘরে নিয়ে যায় ছোট কাকা। আমরা কালকেই আসতাম সুনামগঞ্জ এসে লঞ্চ মিস করে ফেলেছিলাম, বলতে বলতে ব্যাগ থেকে দিবসের ইদের জামা বের করে দিল মেজো কাকা। এক অদ্ভুত আনন্দ দিবসের চোখে, তার অভিমান আর নাই। দিবসের অভিমান  জামা পেয়ে কমেছে ঠিকই; কিন্তু চাচাদের দেখার পর ইদের আনন্দ একফোঁটাও কমেনি সেদিন।

দুই যোগের বেশি সময় পর আমি যখন লেখাটা লেখছি তখনও দিবসদের বাড়িতে লঞ্চে যেতে হয়! গুগল করে মিনিটে বিশ্ব ঘুরতে পারবেন কিন্তু জয়শ্রী যেতে লাগবে ছয় ঘন্টা। কেউ এই ওদের যাতায়াত কষ্ট দেখে না। ভীষণ কষ্ট মেনে নিলে লঞ্চের বিকল্প হিসেবে জামালগঞ্জ থেকে ট্রলারে জয়শ্রী যাওয়া যায়। আমি শুনেছি দিবসরা সিলেটে থাকে। আর তার বাবা-কাকারা বাড়িতে সেটেল্ড। দুই যোগ আগের দিবসের মতো তার বাবা-কাকারাও চাঁদরাতের গোড়ার দিকে লঞ্চঘাটে দিবসদের জন্য আকুতি নিয়ে হয়ত অপেক্ষা করে। এবছর মহামারীর জন্য হয়ত দিবসরা বাড়িতে ফিরবে না। আমরা বেঁচে থাকার জন্য কত কত দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বাঁচি, ভাবতে পারেন!