২১, আগস্ট, ২০২০, শুক্রবার | | ২ মুহররম ১৪৪২

চারিদিকে ত্রাণ বিতরণের ছড়াছড়ি, তবুও কেন কিছু মানুষ এখনো বঞ্চিত?

আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০২০

  • Facebook Share
চারিদিকে ত্রাণ বিতরণের ছড়াছড়ি, তবুও কেন কিছু মানুষ এখনো বঞ্চিত?

সেদিন আমার এক আত্মীয় ফোন করে জানালেন, “কাজ বন্ধ থাকায় তার বড্ড অভাবে দিন যাচ্ছে। জমানো অল্প কিছু টাকাই এখন তার একমাত্র সম্বল। ফুরিয়ে গেলে কী করবে জানে না। এসব কথা শুনে অামি তাকে টিসিবির তেল-চিনি বিক্রির খবরটা দিলাম। এতে তাঁর কিছুটা সাশ্রয় হতে পারে বলে পরামর্শ দিলাম। 

লোকটি সচেতন মানুষ, তাই তিনি করোনা প্রতিরোধে সরকারের দেয়া নির্দেশনাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে মেনে চলছেন। অার এই নির্দেশনা মানতে গিয়েই হলো যত ঝামেলা। তিনি টিসিবির পণ্য কিনতে পারলেন না। একজন সচেতন মানুষের দ্বারা সেটা সম্ভবও নয়। 
তিনি টিসিবির পণ্য কিনতে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেখানকার দৃশ্য দেখে ফিরে অাসতে বাধ্য হয়েছেন। সরকার একদিকে মানুষকে সচেতন করছে। অন্য দিকে পিঁপড়ার লাইন বানিয়ে পণ্য দিচ্ছেন। অামি ব্যাপারটিকে সেভাবে উপস্থাপন করতে চাই না। অাসলে সমস্যাটি হলো একই সমাজে দ্বিমুখী মানসিকতার মানুষের উপস্থিতি। ত্রাণের বাজারে অসচেতন মানুষের উপস্থিতিতে সচেতন মানুষগুলো দরিদ্র হয়েও সুবিধা বঞ্চিত থাকছে। সরকারের দোষ না দিলেও এটুকু অন্তত বলব, পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতে সরকারি সহায়তার সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। একজন মানুষ যদি সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে গিয়ে সেই সরকারি সহয়তা থেকেই বঞ্চিত হয়, তবে তা দূঃখজনক। এই বোধটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদয় হওয়া জরুরী।
নড়াইল তথা সারা দেশে এই মূহুর্তে অনেকেই ব্যাক্তি উদ্যোগে বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে খাবার বিতরণ করছে। প্রত্যেকে ৫০,১০০, ২০০০, ৩০০০ কর্মহীন পরিবারকে সহায়তা করছে। এগুলো যদি একসাথে হিসাব করা হয় তবে দেখা যাবে, মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও অনেক দরিদ্র মানুষ এখনো সহায়তা বঞ্চিত বলে প্রায়ই খবর পাওয়া যায়। এর মূলে কিছু চিহ্নিত সমস্যা রয়েছে, 
প্রথমত, প্রত্যেকে অালাদা অালাদা ভাবে ত্রাণ বিতরণ করছে। তাই কে অাগে পেয়েছে বা কে পাইনি সেটা নির্ধারণ করাটা বেশ দূরূহ হয়ে পড়ছে। অামি নিজে চাক্ষুষ করেছি, শহরের এক জনপ্রিয় চায়ের দোকানদার এই পর্যন্ত ৮ প্যাকেট ত্রাণ পেয়েছেন। কারণ তার দোকানে যেসব মানুষের অাড্ডা তারাই এখন ত্রাণ বিতরণ করছে। অন্যদিকে ভ্যানওয়ালা এক কাকা অভুক্ত থাকছে। কারণ তার ভ্যানে এই সকল ত্রাণ দাতারা ওঠে না। ত্রাণ দাতারা চলে ইজি বাইকে কিংবা নিজস্ব বাইকে। 
দ্বিতীয়ত, কিছু শ্রেণী অাবার এখন একটা শ্লোগান তুলেছে। অাপনি যাকে ত্রাণ দিচ্ছেন, সে ফকির নয়। তাদের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করবেন না। অামি একটা জিনিস বুঝি না, করোনার প্রদূর্ভাবে কর্মহীন মানুষদেরকেই যে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। সেটা কী এই পোস্ট না দিলে কেউ জানত না!! ফেসবুকে যারা ছবি দেখছে, তারা কী এই সত্যটি জানে না? নাকি ত্রাণ নিতে দেখে সবাই তাকে ফকির ভাবছে? অাসল সমস্যাটি হলো গোড়ায়, একই সাথে দু’জনের কাছ থেকে ত্রাণ নেয়ার ছবি যদি জনসম্মুখে চলে অাসে, তাহলে তো অন্য কারো কাছে গিয়ে অার চাওয়ার জায়গা থাকল না। এখানে উল্লেখ্য, অামি ছবি তুলে তা ফেসবুকে অাপলোড দিতে উৎসাহিত করছি না। তবে ছবি তোলার ফলে দুই-তিন বার সহায়তা নিতে গেলে মানুষের মনে একটু হলেও সঙ্কোচ কাজ করত। অবশ্য অাত্ম সম্মানের দিক বিবেচনায় এই প্রসেসটি অলরেডি বাদ পড়েছে।
অারেকটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করি, কিছুদিন অাগে এক চায়ের দোকানদার অামাকে ফোন করল। তার ভাষ্যমতে, তিনি এখানকার ভোটার না হওয়ায়, কারো কাছ থেকে ত্রাণ পাচ্ছে না। বিগত দিনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এমন ঘটনাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিতে পারিনি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা অসম্ভব নয়। অামি তৎক্ষনাৎ একজন স্বেচ্ছাসেবীকে ফোন করে বিস্তারিত খুলে বললাম। কিন্তু সে লোকটির নাম শুনেই অামাকে অবাক করে দিয়ে বলল, লোকটি নাকি তাকেও গতকাল ফোন করেছিল। সে তাকে বাজার করার জন্য ৫০০ টাকা পাঠিয়েও দিয়েছে।অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, “খাদ্যের অভাবে পৃথিবীতে কখনো দূর্ভিক্ষ হয়নি, হয়েছে সুষম বণ্টনের অভাবে।”বাংলাদেশে হলেও সেই কারণেই হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই বক্তব্যটি মনে অাছে? “সাত কোটি বাঙালি, অাট কোটি কম্বল দিলাম। অামারটা কোথায়!!”এই বক্তব্য শুনে এটা বোঝা যায় যে, বাংলাদেশে তখনও সুষম বণ্টন হয়নি। অার এখন যে হচ্ছে না, তা অামরা সবায়ই দেখছি। এমন প্রেক্ষাপটে অামরা হরহামেশাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরকে দোষারোপ করে থাকি; কিন্তু এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তা সঠিক পন্থা নয়। অামাদেরকে একটু সিস্টেমের দিকে নজর দিতে হবে। সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথে হাঁটা যেতে পারে। ত্রাণ দেয়ার জন্য প্রযুক্তির ব্যাবহার করা যেতে পারে। দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত রাখার জন্য বেসরকারি সংস্থার দ্বারা তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে। তারপর সেই তালিকায় উল্লিখিত নামগুলো সরকারিভাবে যাচাই-বাছাই পূর্বক একটি ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে। সকল ত্রাণ দাতা প্রতিষ্ঠানকে এই ডাটাবেইজটির এডিট এক্সেস দিতে হবে। যাতে কে কাকে কতটুকু ত্রাণ দিচ্ছে, তার হিসাবটা যে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলেই দেখে নিতে পারে। ‘এতে কেউ খাবে অার কেউ খাবে না” নামক সিস্টেমটিকে সহজেই কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এছাড়া তরুণ সমাজ এই সিস্টেমটিকে স্বাগত জানাবে বলে অামি অাশাবাদি।
লেখক: অচিন্ত্য অাসিফ