আপডেট: মে ২৫, ২০১৯

আপডেট:

চশমাটা যে কই রাখলাম… ঝাপসা চোখে চশমা খুঁজতে খুঁজতে আপন মনে বিড় বিড় করে বলতে লাগল আসলাম সাহেব। চশমা ছাড়া আজকাল খুব একটা দেখতে পান না। টেবিলে হাতড়াতে হাতড়াতে হঠাত্ স্টীলের পানির গ্লাসটা পড়ে গেল। পানি না থাকায় ঝনঝন একটা আওয়াজে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। পাশের রুম থেকে চেঁচিয়ে উঠল ফারহান।:দেখে-শুনে চলতে পারো না?
ছেলের এরকম ধমক শুনে চোখ দিয়ে পানি চলে আসল। শুনেও না শোনার ভান করে চশমা খুঁজতে লাগল আসলাম সাহেব। সাহিদা যখন বেঁচে ছিল তখন ওইই সব কিছু এনে এনে দিত। প্রায় তিন মাস হয়েছে আসলাম সাহেবকে একা রেখে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে সাহিদা। কত্ত সুন্দর একটা সাজানো গোছানো সংসার ছিল আসলাম সাহেবের। একটা বেসরকারী ব্যাংকে অফিস সহকারী পদে ছিলেন। সাহিদা, ফারিহা আর ফারহান, স্ত্রী আর এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল। বড় মেয়েটা এখন আমেরিকায় থাকে স্বামীর সাথে। ছেলেটা সরকারি একজন আমলা। ছেলে মেয়ে দুজনকেই মানুষ করে তুলেছেন। অনেক কষ্ট করে বড় করে তুলেছেন তাদের। খুব ভালবাসতেন ছেলেমেয়েদের। সাহিদাকেও খুব ভালবাসতেন। ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেয়ার পরেই বুঝতে পারেন যত বেশি ভালবাসা হয় তত বেশি কষ্ট পেতে হয়। সাহিদা যখন ছিল তখন ওর সাথেই কষ্টগুলো শেয়ার করত আসলাম সাহেব। এখন আপন বলতে কেউ নেই। ছেলের ঘরে একটা নাতি আছে, ওটাকেও কাছে আসতে দেয় না ছেলের বউ। আপন বলতে সাহিদার একটা ছবি। আর একটা চাদর। এক বিবাহবার্ষিকীতে সাহিদাকে উপহার দিয়েছিল চাদরটা। খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছিল সাহিদা। বলেছিল,-আমি যখন মরে যাব তখন তো একা হয়ে যাবে,তখন চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিও, দেখবে আমাকে খুঁজে পাবে।কথাগুলো এখনো কানে বাজে আসলাম সাহেবের। চশমা খোঁজা বাদ দিয়ে চাদর খুজঁতে লাগল। আলমারীর একদম উপরের তাকটাতেই সবসময় থাকে চাদরটা।.ওই যে আলমারিটা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। আলমারি থেকে চাদরটা বের করে গায়ে দিতেই হাউমাউ করে ছোট বাচ্চার মত কান্না শুরু করে দিল আসলাম সাহেব। জীবনের পয়তাল্লিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছে যেই মানুষটার সাথে, সেই মানুষটার কথা মনে হতেই চোখের পানি ধরে রাখা মুশকিল। চাদরটা গায়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল আসলাম সাহেব। .-ফারহান, ফারহান…খানিকটা নিচু গলায় ছেলেকে বার দুয়েক ডাকলেন আসলাম সাহেব। .ঘড়িতে তখন নয়টা চল্লিশ। ফারহান অফিসে যাওয়ার জন্যে রেডি হচ্ছে। তাই বাবার ডাকে কান দিয়ে টাইটা বাধতে লাগল। .খানিক দম নিয়েই আবার ডাকতে লাগলেন,-ফারহান… ফারহান….ফারহান এবার অনেকটা বিরক্তির সুরে জবাব দিল,-কি হয়েছে… ষাঁড়ের মত এত চেঁচাচ্ছ কেনো?গলার স্বর একদম খাদে নামিয়ে আসলাম সাহেব বলল,:তোর মাকে দেখতে মন চাচ্ছে অনেক। মনটা ছটফট করছে খুব। একটু কবরটা থেকে ঘুরে আসতে চাচ্ছি কিন্তু সেই সকাল থেকে চশমাটা খুঁজছি, পাচ্ছিই না। একটু খুঁজে দেতো বাবা।-আমি কি তোমার চাকর নাকি? আমাকে বলছ কেন? বুয়াকে বললেই তো পারো।
এবার আর ধৈর্য্যের বাধ রাখতে পারল না ফারহান। নিজ বাবাকে কড়া একটা ধমক দিল। .আসলাম সাহেব চাদর দিয়ে চোখের জলটা আড়াল করার চেষ্টা করল। হঠাত্ পাশের রুম থেকে ফারহানের ছেলে রিহান দৌড়ে এসে বলল,-আব্বু… আব্বু… আমার ড্রয়িং খাতাটা খুজে দাওনা….আব্বু আব্বু দাওনা খুজে। এই কথা বলতে বলতে ফারহানের আঙ্গুল ধরে টানতে টানতে ফারহানকে নিয়ে যেতে লাগল।.ছেলেকে কোলে দিয়ে চুমু খেতে খেতে বলল,-এই নিয়ে দশবার খাতা খুজে দিলাম আব্বু, প্রতিবারই দুষ্টামি করে লুকিয়ে রেখেছো। এরকম দুষ্টামি করে না বাবা। অফিসের লেট হয়ে যাচ্ছে।.রাগটা কমতে শুরু করছে ফারহানের। আসলাম সাহেব ছেলেকে ডাক দিয়ে বলল,-বাবা, দুই মিনিট সময় হবে তোমার?:যা বলার জলদি বলো। রাগ নেই তবুও গলার তেজটা একটু রয়েই গেছে।-বাবা তুমি যখন ছোট ছিলে তখন তুমিও এরকম একদিন করছিলে। ঠিক আজকের মত এরকম একটা দিন। আমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছিল। আমি খুব তাড়া দিচ্ছিলাম তোমার মাকে আমার টাইটা বেধে দেয়ার জন্যে। .খানিকটা বিরতি দিয়ে আবার শুরু করল আসলাম সাহেব।-সেদিন বাসার বাইরে একটা ভিক্ষুক এসেছিল। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করলে,:আব্বু ওটা কি?আমি বললাম, -ওটা ভিক্ষুক।তুমি আবার বললে,:আব্বু… ওটা কি?আমি আবার বললাম,-ওটা একটা ভিক্ষুক। একরম একবার দুইবার নয়। একুশ বার আমাকে জিজ্ঞেস করছিলে, বাবা ওটা কি? আমি একুশ বারই বলছিলাম, ওটা একটা ভিক্ষুক। বিশ্বাস করো বাবা, একটা বারের জন্যেও আমি বিরক্ত হই নাই। .বলেই ছলছল করে চোখের পানি ছেড়ে দিল আসলাম সাহেব।-ঠিক আছে বাবা, অফিসে যাও, তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। .বলেই বিছানায় শুতে যাবে এমন সময় বাবার চাদরটা টেনে ধরল ফারহান। মনের অজান্তে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ফারহানের। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,:বাবা, তোমার কাছে একটা জিনিস চাইব দিবে?-কি জিনিস? আমার তো কিছুই দেয়ার বাকী নাই আর। অভিমানের সুরে উত্তর দিল আসলাম সাহেব।:তোমার সাথে আজকে মাকে দেখতে যাব বাবা। সাথে নিবে আমাকে? এ কথা বলেই বাবার পা ধরে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল ফারহান। আর বলতে লাগল, আমাকে মাফ করে দাও বাবা। আমাকে মাফ করে দাও।
আসলাম সাহেব ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বলল,-ধুর পাগল।কিছু মনে করি নি তো। তোমাদের বড্ড ভালবাসি ফারহান। খুব মিস করি তোমাদের ছেলেবেলার সময়গুলোকে।.বাবার বুকে মাথা লুকিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কান্নাজড়িত গলায় ফারহানও উত্তর দিল,:ক্ষমা করো বাবা। আর একা থাকতে হবে না তোমাকে। তোমাকেও ভালবাসি। .গল্প ।। বাবালেখা ।। এম হাসান রানা