২৫, নভেম্বর, ২০২০, বুধবার | | ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে হবে

আপডেট: জানুয়ারি ৬, ২০২০

  • Facebook Share
তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে হবে

লেখনীয়ঃ. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী,ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 
তরুণদের নিয়ে অনেক কিছু আমরা বলে থাকি। তাদের ইতিবাচক বিষয়ের চেয়ে নেতিবাচক বিষয়গুলোই বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু কখনো আমরা ভেবে দেখি না কিভাবে তরুণদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে ইতিবাচক চিন্তাধারায় নিয়ে আসা যায়। একটি বিষয় আমরা ভাবতে পারি, হয়তো অনেকেই এটি নিয়ে ভাবি; কিন্তু বাস্তবে এটি আমরা দেখতে পাই না। এখানেই আমাদের মূল দুর্বলতা। আমরা অনেক স্বপ্ন দেখি, অনেক ভালো কিছু বিশ্বাস করি, বড় বড় পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মহাপরিকল্পনার কথাও বলি। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের কোথায় যেন একটা পিছুটান। সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে খুব ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে তরুণদের জন্য ভাবতে পারি। তাদের সফলতার আর অনুপ্রেরণার গল্প শুনিয়ে খুব সহজেই তাদের মনকে বদলে ফেলতে পারি। হয়তো এ ধরনের একটি গল্পেই বদলে যেতে পারে তরুণদের জীবন। হয়তো দেখা যাবে হতাশ একজন তরুণ আশান্বিত হয়েছে, মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা একটি ছেলে মাদককে ‘না’ বলেছে, জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি ছেলে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছে।
১৩ বছরের ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিশু স্পর্শ শাহের বিষয়টি তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হতে পারে। সে ব্রিটল বোন সিনড্রোম নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছে। এই রোগের কারণে তার শরীরে ১৩০টিরও বেশি ফ্র্যাকচার রয়েছে। হয়তো এ কথা শুনে অনেকেই ভাবতে পারেন, এ অবস্থা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু এই শিশুটি বলছে, ‘কোনো কিছুই আমার মনোবল ভাঙতে পারবে না কিংবা আমাকে গান থেকে বিরত রাখতে পারবে না।’ ভাবতেই অবাক লাগবে এ অবস্থা নিয়ে ছেলেটি ভারতীয় রাগসংগীত ও আমেরিকার র‌্যাপসংগীতের সমন্বয় করে নতুন ধরনের সংগীতের জন্ম দিয়েছে। এই ধারণাকে কেন্দ্র করে সে ‘ট্রিবুট টু এমিনেম’ নামের একটি অ্যালবাম বাজারে ছাড়ে; যার প্রতিটি গান সে নিজেই করেছে। এই অ্যালবাম থেকে অর্জিত টাকায় সে আমেরিকার বোস্টনের ব্রাকলি কলেজে লেখাপড়া করছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মানুষকে অনুপ্রাণিত করার জন্য বিখ্যাত টেপ টকের সে একজন মোটিভেশনাল বক্তা। এ ধরনের আরেকজন মানুষের গল্প আমরা তরুণদের প্রেরণা জোগাতে জানাতে পারি, যিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে মানসিক শক্তির মাধ্যমে জয় করেছেন। মায়ের গর্ভ থেকে টেট্রা এমিলিয়া নামে বিরল সিডিরোম নিয়ে হাত-পা ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেন অস্ট্রেলিয়ার নিক ভুজিসিস। নার্স যখন নিক ভুজিসিসকে মায়ের কাছে নিয়ে এলো তখন এই ধরনের বিকলাঙ্গ শিশুকে দেখে মা তাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ‘এটিকে সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা’ হিসেবে বিবেচনা করে তাকে গ্রহণ করেন। এই ভুজিসিস ২০০৫ সালে ‘লাইফ উইদাউট লিম্বস’ নামের অলাভজনক একটি মোটিভেশনাল প্রতিষ্ঠান গড়ে  তোলেন। ইউটিউবে এ প্রতিষ্ঠানের নামে চ্যানেলটির প্রায় এক লাখ ১৫ হাজারের মতো সাবস্ক্রাইবার। তিনি হাত-পা ছাড়াই বিশাল সুমদ্র স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে পারেন, তিনি ফুটবল খেলতে পারেন, তিনি ছবি আঁকতে পারেন, স্কাই ডাইভার হিসেবে শূন্যে উড়তেও পারেন। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জিং কাজ তিনি করতে পারেন। অনেক বিখ্যাত বই যেমন ‘লাইফ উইদাউট লিমিটস’, ‘দ্য পাওয়ার অব আন স্টপেবল ফেইথ’, ‘লাইফ উইড আউট লাভ’ ইত্যাদি বইয়েরও লেখক। তিনিও টেপ টকের একজন মোটিভেশনাল বক্তা হিসেবে গোটা পৃথিবীর অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর অনুপ্রেরণার গল্পে তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, ‘একজন মানুষ যদি হাত-পা ছাড়াই বড় স্বপ্ন দেখতে পারে, তবে আমরা কেন নয়।’ এখান থেকে তরুণদের শেখানো যেতে পারে, মানুষ কখনো তার স্বপ্নের সমান আবার কখনো তার স্বপ্নের চেয়েও বড়।
বিগ ব্যাং থিওরির প্রবক্তা বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে দুরারোগ্য মোটর নিউরন ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। আমেরিকায় এই রোগকে বলা হয় লো গ্রেইরিজ ডিজিজ। চিকিৎসকরা হকিংসকে জানিয়ে দিলেন, তিনি আর দুই থেকে আড়াই বছর বাঁচবেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাঁর সব কিছু প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ায় তাঁকে হুইলচেয়ারের বিজ্ঞানী বলা হতো। হকিংস চিকিৎসকদের কথায় ভেঙে পড়েননি, বরং নিজের ভাবনাকে ইতিবাচক করে গবেষণার আনন্দ ও সৃষ্টিতে মেতে উঠলেন। এটাকেই বলা হয় ঘুরে দাঁড়ানো, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানকেও হার মানিয়েছে। যেখানে দুই-আড়াই বছর বাঁচার কথা, সেখানে তিনি আরো ৫৪ বছর বেঁচে থাকলেন। এটা কি মিরাকল, নাকি ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন। এটা যে মিরাকল ছিল না, এটা যে জীবন বদলে ফেলার ইতিবাচক মনোভাব—বিষয়টি আমাদের তরুণদের বোঝাতে হবে। মানুষ যদি শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা সত্ত্বেও শুধু নিজের জীবন নয়, অন্যদেরও জীবন পাল্টে দিতে পারে, তবে আমাদের তরুণরা পারবে না কেন। তরুণদের এ বিষয়গুলো বোঝানোর মতো নেতৃত্ব গ্রহণ করার দায়িত্ব আমাদের সমাজের সবার। আমরা শুধু ব্যর্থতা, হতাশা, বেকারত্ব ও তরুণদের নেতিবাচক বিষয়গুলো বেশি শুনে থাকি। কিন্তু তরুণরাও যে দেশ, মানুষ ও পৃথিবী বদলে ফেলতে পারে তার প্রচার-প্রচারণা তেমন একটা নেই। ফেসবুক, টুইটার, স্ক্রাইপি, ভাইবার, লিংকডিনে তরুণরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে আমরা হা-হুতাশ করছি। কিন্তু এগুলো ব্যবহার করেই তরুণরা যে আউটসোর্সিং করছে, অনলাইন শপিংয়ের মতো নতুন ধারণা সৃষ্টি করছে। বিদেশি গবেষকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করে গবেষণার জ্ঞানকে আদান-প্রদান করছে, সে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কিছুই বলছি না। জ্যাক মা নামটি আমরা হয়তো সবাই জানি। কিন্তু তাঁর ব্যর্থতা থেকে সফল হয়ে ওঠার গল্প আমরা কয়জনই বা জানি। ছোটখাটো গড়নের চীনা মানুষটি এখন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের কম্পানি আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু এই অর্জন এক দিনেই গড়ে ওঠেনি। একটার পর একটা ব্যর্থতার পরই এসেছে এ ধরনের সফলতা। চীনের একটি সরকারি কলেজে তাঁর ভর্তি হতে তিন বছর সময় লেগেছিল, হার্ভার্ডে ১০ বার আবেদন করে ১০ বারই ব্যর্থ হন। চাকরির বাজারেও বারবার তাঁকে হোঁচট খেতে হয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০টি কম্পানিতে আবেদন করেও তিনি চাকরি পাননি। পুলিশের চাকরিতেও যেমন তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, তেমনি কেএফসির মতো প্রতিষ্ঠানে ২৪ জনের মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হলেও তাঁর সেখানেও চাকরি জোটেনি। এই ব্যর্থ মানুষটি যে ঘুরে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, তা আমরা তরুণদের সেভাবে বলতে পারিনি।
এখন দরকার আমাদের গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তরুণদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এ পি জে আবদুল কালাম, আইমান সাদিক, বিল গেটস, স্টিভ জবস, মার্ক জাকারবার্গ, টমাস আলভা এডিসন, আইজ্যাক নিউটন, আইনস্টাইন, শেকসপিয়ার, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মানুষদের সফলতা ও অনুপ্রেরণার গল্প শুনিয়ে বদলে ফেলতে চাই তাদের জীবন। তরুণদের আমরা এ পি জে আবদুল কালামের মতো করে বলতে চাই—স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে স্বপ্ন দেখতে হবে।