১০, মে, ২০২১, সোমবার | | ২৮ রমজান ১৪৪২

কত রক্তে রঞ্জিত, আমরা বাঙালি জাতি

আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০১৯

কত রক্তে রঞ্জিত, আমরা বাঙালি জাতি

আমরা বাংলাদেশী নাগরিক। তবে জাতি হিসেবে বাঙালি। গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ৬ ধারার ২ উপধারায় বলা আছে যে, ”বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।”

জাতি হিসেবে পরিচিতি পাবার অন্যতম একটি উপায় হলো নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্য, যার কোনটিরই অভাব নেই আমাদের। আমাদের প্রাণের ভাষা দ্বারাই আমরা বিশ্ববাসীর নিকট পরিচিত। বিশ্ববাসী আমাকে চিনবে আমাদের ভাষা দিয়েই। আমাদের মুখের কথা দিয়েই। আমাদের বাগ্‌যন্ত্রে উচ্চারিত ধ্বনি-প্রতিধ্বনি সমৃদ্ধ শব্দ দিয়েই। যেমনি করে দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা বাঙালি। তেমনি করে জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত, যতদিন পৃথিবী থাকবে, এমনকি মৃত্যুর পরও, ততদিন আমরা বাঙালি আর বাংলাদেশী। বুক ভরে যায় যখন আমরা গাইতে থাকি- আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

আমরা যেই জাতি, সেই জাতির বসবাস উত্তরাধুনিক পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তেই কম বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা আর ত্রিপুরাতেই মুলত এদের আনাগোনা বেশি। এশিয়া মহাদেশ ছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের বিভিন্ন স্থানে চাকুরী বা অন্যান্য উদ্দেশ্যে প্রচুর বাঙালি স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এই আন্দাজে বল্‌লে, সারা বিশ্বে মোট বাঙালি জাতির লোক সংখ্যা প্রায় পঁচিশ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

বাঙালি জাতির উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব প্রচলিত আছে। ড. মুহাম্মদ আবদুল হান্নান তাঁর ‘বাঙালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, হযরত নূহ (আ) এর সময় সংঘটিত মহা প্লাবনের পর চল্লিশ জোড়া নর-নারীকে বংশ বিস্তার আর বসতী গড়ার লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। হযরত নূহ (আ) এর পুত্র ’হাম’ পিতার নির্দেশে এশিয়ায় পদার্পণ করেন। হামের দুই পুত্র যথাক্রমে ‘সিন্‌ধ’ ও ‘হিন্‌দ’ দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেন এবং বসবাস শুরু করেন। ধারণা করা হয় ’সিন্‌ধ’ এর নামানুসারে ‘সিন্ধু সভ্যতা’ আর ‘হিন্‌দ’ এর নামানুসারে ‘হিন্দুস্থান’ নামকরণ করা হয়। তাদের বসবাস আর দিন যাপনের সাথে সাথে লোকারণ্যে ভরপুর হতে থাকে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর অবধি এলাকা। কথিত আছে যে, সিন্‌ধ এর পুত্র সন্তান, নাম তার ‘বঙ্গ’, পিতার নির্দেশে ভাগীরথী নদী পেরিয়ে এর পূর্ব দিকে চলে আসেন এবং বসতী স্থাপন করেন। তার পুত্র ‘আহাল’ এর পরবর্তী প্রজন্ম ’বঙ্গাহাল’, ’বঙ্গাল’ বা ’বাঙ্গালী’ নামে পরিচিতি লাভ করতে থাকে।

আরেক তথ্যমতে জানা যায় যে, প্রাচীন এই ভু-খন্ডে এক সময় ‘বলি’ নামে এক রাজার বেশ দাপট ছিল। এই বলি রাজার ছিল পাঁচ পুত্র। তাদের নাম ছিল যথাক্রমে অং, বং, সূক্ষ, পুন্ড্র, ও বরেন্দ্র। বলি রাজা জীবিত তাঁর জীবদ্দশায় ছেলেদের মাঝে তার বিশাল রাজ্যকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করে দেন। বলি রাজার মৃত্যুর পর তার ছেলেরা উক্ত রাজ্যগুলো শাসন করতে থাকে এবং তাদের নামানুসারেই এক একটি জনপদের নাম হয়ে যায়।


আরও বলা যায় যে, এই বাংলায় সে সময় জমিগুলোতে বড় বড় ”আইল” তৈরি করে পানি ধরে রেখে চাষাবাদ করা হত। এসব ‘আইল’ বা ’আল’ এর পূর্ব নাম ছিল ’আহাল’ । তাই বাংলার আশে পাশের লোকজন যখন বাংলায় আসত তখন এসব ‘আল’ দেখে বলত ‘বঙ্গের আহাল’ যা কালক্রমে মুখ থেকে মুখে জায়গা করে নেয় ‘বঙ্গাহাল’ বা ‘বঙ্গাল’ নামে।

বাঙালি জাতির শব্দগত উৎপত্তি আর বিন্যাস দেখলে আমরা পাই- বঙ্গ(ব্যক্তি)> আহাল(সন্তান/জমির বড় বড় আইল)> বঙ্গাহাল > বাঙাল > বাঙালি

‘বঙ্গ’ শব্দটি প্রাচীন হলেও ‘বাংলা’ শব্দটি অর্বাচীন। প্রাচীন যে যে সাহিত্যে বা ঐতিহাসিক শিল্পে বঙ্গ শব্দটি জড়িত তা যদি একটু খুঁজতে বের হই, তাহলে আমরা পাই-

 * ঋগ্বেদের ঐতেরেয় অরণ্যক এর ২:১:১ শ্লোকে। (ঋক, শাম, যজু, অথর্ব- এই চারটি মহাগ্রন্থ হলো সনাতন ধর্মের চারটি জীবন বিধান)

* মহাভারতের একটি অধ্যায় এর একটি অংশ, নাম তার “পতঞ্জলী ভাষ্য”-এর একটি স্থানে।

* রোমের প্রাচীন কবি ওভিদ এর কবিতায় এবং দার্শনিক টলেমির লেখায় আমরা গঙ্গা নদী বিধৌত বাংলার প্রাচীন রূপের বর্ণনা পাই।

এদেশে ’বাংলা’ নামটির সূচনা হয়েছে মূলত ক্রয়োদশ শতকে মুসলমান অধিপত্য বিস্তারের পর। সুলতানী আমলে, বিশেষ করে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ-এর আমলে আমাদের এই নদী বিধৌত অঞ্চলকে বলা হত ‘সুবেহ বাঙ্গালা’। এর পর কত বিদেশী শক্তির পায়েল ধূলি পড়ল আমোদের এই দেশে তা বলার আর অপেক্ষা রাখেনা।

এক সময় পর্তুগীজরা এসে আমাদের ডাকতে থাকে ‘বেঙ্গলা’। দুষ্টুর জাত এই উপনিবেশিক শক্তির মধ্যে পরবর্তীতে ফরাসীরা ( ফ্রান্সের অধিবাসী) আমাদের বাংলাকে বিকৃত করে ‘বাঙ্গালাহা’ ডাকতে থাকে। কুচক্রী এসব বিদেশী দখলদারদের মধ্যে ভাব সাব দেখিয়ে আর রাজনীতির কলা-কৌশলের দ্বারা ক্ষমতায় আসে সাদা চামড়ার ইংরেজ জাতি। তারাই বৃটিশ জাতি। তারা আমাদের প্রিয় মাতৃ ভূমিকে ডাকত ‘বেঙ্গল’(Bengal) বলে। এই ’বেঙ্গল’ শব্দটি এখনও প্রচলিত। আমার কথা হল যে, এটা আমরা মানতে যাব কেন? ‘বাংলা’ মানে ইংরেজিতেও ‘Bangla’- ই। সেই বৃটিশ যুগ কবেই চলে গেল! পাকিস্তান আমলের উর্দু যুগও পার করেছে আমাদের এই জনম দুখি বাংলা। এখনও বুঝি এসব আগের মতই থাকবে।

সব কথার পরের কথা হলো যে, সর্বপ্রথম দেশবাচক শব্দ হিসেবে ’বাংলা’ এর নাম আমরা পাই মোঘল সম্রাট, মহামতি, জালালুদ্দীন মুহাম্মদ আকবরের রাজ সভার নবরত্নের এক রত্ন জনাব আবুল ফজলের লেখায়। তিনি লিখেছিলেন সম্রাট আকবরের শাসনতন্ত্রের কতিপয় উল্লেখযোগ্য দিক। সেখানেই তিনি সেই সময়ের অপরাজেয় আর বারো ভূঁইয়্যাদের দাপটের এই উর্বর ভূমির নাম দিয়েছিলেন ’বাংলা’। যে বইটিতে তিনি এ কীর্তি গড়েছিলেন সেই বইটির নাম ছিল ‘আইন-ই-আকবরী’।

আমি বাঙালি। আপনিও বাঙালি। তোমরাও বাঙালি। যারা বাংলা ভাষায় লেখা আমার এই কথাটি বুঝতে পারছেন, তারা সবাই বাঙালি। কারণ আমি জানি, আমরা শুধু এই কথাটি বুঝিই না, সাথে সাথে অন্তরেও ধারণ করি। লালন করি। আমরা বাঙাললি জাতি নানান রঙে মিশ্রিত এক জাতি। বিচিত্রতা আমাদের বৈশিষ্ট্যের আলাদা পালক। কারণ আমরা সংকর জাতি। ’সংকর’ মানে হল বেশ কিছু ধারার মিশ্রণ। আমাদের ধারাটা হলো মিশ্রিত একটি ধারা। এই সূত্র ধরে বলা যায়, প্রাচীন বাংলার অধিবাসীদের দু’ভাবে দেখা হয়- আর্য এবং অনার্য। যদি সেই যুগকে ভাগ করা যায়, তবে লেখা যায়- ‘প্রাক আর্য যুগ’ এবং ‘আর্য পরবর্তী যুগ’।

যুগ যুগ ধরে নদীর স্রোতের মত বইছে বাংলার মানুষের জীবন ধারা। তাদের গল্পের ধারা। সবুজ-শ্যামল আর সুজলা-সুফলা এই বাংলা যেন শুধু একটি জায়গা নয়। শুধু একটি দেশ নয়। শুধু একটি জনপদ নয়। যেন একটি স্বর্গ! যেখান থেকে দেখা যায় প্রকৃতির লীলা আর অবারিত রূপ। মনের

অজান্তেই মুখে চলে আসে সেই বিখ্যাত লাইন দুটো-

বসুন্ধরার বুকে বরষারই ধারা, 
তারা ভরা আকাশ ।

বাঙালির কথা বলতে বলতে , লিখতে লিখতে, আর বাংলার গান গাইতে গাইতে অনেক বেলা গড়িয়ে গেল। কালে কালে,যুগে যুগে আর সময়ে সময়ে বিভিন্ন রং ধারণ করেছে পলিমাখা এই বঙ্গভূমি। এই রঙ অন্য কোন রং নয়। এই রঙ হলো’লাল রং’। রক্তিম সূর্যের রং। আমাদের পতাকার মাঝখানের গোলাকার স্থানের রং। এই রং অনেক ত্যাগ তিতীক্ষার রং,অনেক ঘটনার স্বাক্ষীর রং।

আবার ফিরে আসা যাক আমাদের অস্তিত্বের কথায়। মূলের কথায়। ধরতে গেলে প্রাতিহাসিক যুগ থেকে বাংলায় মুসলমান বিজয়ের আগ পর্যন্ত সময়টাতেই মূলত বাঙালী জাতি ‘সৃষ্ট্রির কাল’ বিস্তৃত। আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে প্রচীন কালে বাঙালী জাতি গোষ্ঠীকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- আর্য পূর্ব জনগোষ্ঠী এবং আর্য পরবর্তি জনগোষ্ঠী। আর্য পূর্ব নরগোষ্ঠীকেও এক দৃষ্টিতে দেখলে হবেনা। তারাও বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। এদের মাঝে প্রধান চারটি পর্যায়ক্রমিক জাতি স্তর দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলো ছিল- নেগ্রিটো,অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়। বলতে গেলে এরাও বাংলার স্থানীয় অধিবাসী ছিলনা। স্থানীয় অধিবাসী বলতে সে সময় যাদের নাম উল্লেখ করা যায়, তারা ছিল অন্তজ সম্প্রদায়। এদের কয়েকটি জাতির নাম ছিল ডোম, চন্ডাল, হাড়ি, কোল প্রভৃতি। এদের সাথে নেগ্রিটো , অস্ট্রিক,দ্রাবিড় আর ভোটচীনীয়রা মিশে যায়। মিশে যায় রক্তের সাথে রক্ত। ভাষার সাথে ভাষা। গানের সাথে গান। কবিতার সাথে কবিতা। মনের সাথে মন। তারপর সব হয়ে যায় এক জাতি।

আর্যদের আগমণ পথ

এখনও বিচরণ করছি আর্য-পূর্ব সময়ে। স্থানীয় অন্তজ সম্প্রদায়ের (ডোম, চন্ডাল,হাড়ি, কোল) সাথে প্রথমে মিশতে আসে নেগ্রিটো জাতের লোকজন। সুন্দর আর মনোরম সমতল ভূমির আকর্ষণ তাদের মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলে। নেগ্রিটোদের আদি উৎপত্তিস্থল আফ্রিকার ইথিওপিয়াতে বলে নৃ-বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। কালো বর্ণ আর লিক লিকে দেহ নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে উপস্থিত হয় তারা মধ্য প্রাচ্যের কোন এক জায়গায়। খ্রিস্ট পূর্ব প্রায় চল্লিশ কী পঞ্চাশ বছর আগের কথা। নেগ্রিটোরা কৃষি কাজ জানতনা। বেশির ভাগই ছিল বৃক্ষচারী। তাদের প্রধান খাদ্য ছিল ফল মূল আর লতা পাতা। দীর্ঘ দিন এসব খাওয়ার পর দশ পনেরো হাজার বছর আগে তারা পারস্য হয়ে ভারতবর্ষে আগমণ করে। কিছু কাল পরে তারা ভাগীরথী নদীর পূর্ব পাড়ে বঙ্গ ভূমিতে এসে ভাত, মাছ আর শাক-সবজির স্বাদ পায়। বদলে যায় তাদের জীবন। বদলে যায় তাদের জীবিকার ধরণ। বর্তমানে আফ্রিকার নিগ্রোরাই তৎকালীন নেগ্রিটোদের উত্তরসুরী।

নেগ্রিটো জাতি

খৃস্টের জন্মের ছয় থেকে সাত বছর আগের কোন এক যুগের কথা। নাতিশীতোষ্ণ এই আবহাওয়ায় নেগ্রিটোদের জায়গা দখল করতে আসে অস্ট্রিক জাতিগোষ্ঠীর মানবেরা। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে অঞ্চলকে তিনটি দেশ (লাউস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম)তাদের সীমানায় বন্দি করে রেখেছে, যে অঞ্চলকে আমরা বলি ‘গণ চীন’, সেই অঞ্চল থেকে আসে অস্ট্রিক জাতি। তবে ততদিনে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। নেগ্রিটোরা যুগ যুগ ধরে বসবাস করে নিজেদেরে রক্তের সাথে স্থানীয়দের রক্তের ঠিকানা তৈরি করে ফেলে। তবে অস্ট্রিক জাতির আগমনের সাথে সাথে নেগ্রিটোদের মূল ধারা বঙ্গ ভূমির বাইরে চলে যেতে থাকে। বঙ্গ ভূমি ছেড়ে তারা ক্রমান্বয়ে চলে যায় মিয়ানমার হয়ে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে সোজা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলে(মেলানোশিয়, মাইক্রোনেশিয়া,পলিনেশিয়া)। আজ অবধি তাদের বসবাস সেখানে নিশ্চিত করা যায়। তবে দূঃখ করে বলতে হয় যে, কী দোষ হত যদি নেগ্রিটোরা আমাদের এই মাটিতে থেকে যেত? চলেই যদি যাবে তবে তোমাদের রক্ত আমাদের রক্তের সাথে মিশিয়ে দিলে গেলে কেন?

অস্ট্রিক জাতি

ধীরে ধীরে অস্ট্রিক জাতিও কেমন জানি এদেশের পরিবেশ-প্রকৃতিকে নিজেদের আপন করতে থাকে। মাঝারি গড়ন আর গোলাকার মুখ মন্ডলের সাথে ধূসর গায়ের বর্ণদের সাথে মিশতে থাকে নেগ্রিত রক্ত মিশ্রিত যৌগিক ’বাংলা’ রক্তের স্রোত। অস্ট্রিক জাতিদের আনাগোনায় বাড়তে থাকে তাদের পরিধি। তারাও বাংলাকে নিজের মত করে সাজাতে থাকে। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার নদী, বাংলার পথ, বাংলার অবারিত মাঠ-ঘাট সব কিছুই তাদের বিচরণে পরিপূর্ণ হতে থাকে। আস্তে আস্তে নেগ্রিটোদের লাল রক্তের সাথে অস্ট্রিকদের লাল রক্ত মিশে তৈরী হয় আরেক নতুন জাতির। সে জাতির নাম হলো ‘ নিষাদ’ জাতি। খুবই কর্মঠ আর উদ্যম জাতি। শারীরিক গড়ন সুঠাম হয় তাদের। অত্যন্ত পরিশ্রমি এই জাতির মানুষের গায়ের রং হয় গৌড় বর্ণের। অনেকটা দেশীয় মাগুর মাছের মতন! নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে, এই ’নিষাদ’ জাতি থেকেই আমাদের বাঙালী জাতির মূল ধারা গড়ে ওঠেছে। এদিকে সিন্ধু সভ্যতার উত্তরসুরী এক প্রকার জাতিগোষ্ঠী, যাদের আমরা ’দ্রাবিড়’ বলে থাকি,তারা দলে দলে আসতে থাকে এই বাংলায়। মূলত এই জাতির বেশির ভাগ মানুষই বা উত্তরসুরীরা বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস করে। বর্তমান ভারতের বেশির ভাগ বাসিন্দাই দ্রাবিড় জাতিগোষ্ঠীর রক্ত বহন করছে। যদিও বাংলায় এরা এসেছে বটে, তবুও নিষাদ জাতির রক্তের সাথে তাদের রক্তের ঢেউ বাড়ি খায় দ্রুত বেগে। মিশে যায় তারাও। তবে মূল অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় কয়েক হাজার বছর পরেই। সৃষ্টি হয় নতুন অস্থিত্ব।

দ্রাবিড় জাতির নমুনাস্বরূপ ভারতীয় কিশোরী

এভাবে চলতে থাকে আরও কয়েক হাজার বছর। বছরের পর বছর যায়। সময়ের নদীও বয়ে যায়। কালের ধ্বনি আর প্রতিধ্বনিতে সরগরম হতে থাকে এই পলি মাখা বাংলা জনপদের বিভিন্ন এলাকা। হঠাৎ আরেক জাতির আগমন। তাদের নাম ’ভোটচীনীয়’। এরা আসে পূর্ব এশিয়ার মঙ্গোলিয়া থেকে। এই জাতির মানুষজন সমতল ছেড়ে পাহাড়েই বসবাস শুরু করে দেয়। তাদের অস্তিত্ব আমরা এখনও দেখতে পাই। বর্তমানে গারো, কোচ, মণিপুরী, চাকমা ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো এই ভোটচীনীয়দের আয়না স্বরূপ।

ভোটচীনীয় জাতি

এরপর বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে যায়। নানা ঘটনায় সম্বৃদ্ধ হতে থাকে আমাদের এই জনম দূঃখী বাংলা। চির সবুজ বাংলা। ঘটে যায় এক অভানীয় ঐতিহাসিক ঘটনা। এটা হলো আগমনের ঘটনা। আগমনের কাল। আর্যদের আগমনের কাল। বর্তমান রাশিয়ার একটি সু উচ্চ পর্বতের নাম হলো ’ইউরাল’।সেটার পাদদেশে গভীর তৃণ ভূমিতে বাস করত অতি উচ্চ শ্রেণির এক প্রকার অভিজাত জাতি। তাদের নাক খাড়া। দেহের বর্ণ ফর্সা। গড়ন লম্বা। সেই ইউরাল পর্বত আর ঘন তৃণ ভূমি ডিঙিয়ে,আফগানিস্তানের খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে সৌখিন আর্য জাতির আগমণ ঘটে প্রায় খৃস্টপূর্ব তিন হাজার বছর পূর্বে। তবে এই বাংলায় নয়। প্রথমে আসে তারা ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে। সেখান থেকে বাংলার অপরূপ রূপের মোহে আর সু-গন্ধে তারা অগণিত নদ-নদী আর পাহাড় পর্বত পেছনে ফেলে চলে আসে বাংলায়। সময়টা তখন খৃস্ট পূর্ব চৌদ্দশ কী পনেরশো শতক। শেষ হয় অনার্য যুগ বা প্রাক আর্য যুগ। শুরু হয় আর্য যুগ। তৈরী হতে থাকে নতুন এক প্রকার বাঙালী রক্ত। সংকর রক্ত।

যাই হোক। পরবর্তীতে মৌর্য ও গুপ্ত বংশের শাসনামল পর্যন্তও এই ’বং’ ভূ-খন্ডে আর্যীকরণ ঘটে। খৃস্টীয় অষ্টম শতকে সোমীয় গোত্রের আরবীয়গণ ধর্ম প্রচার ও বানিজ্যের মাধ্যমে বাঙালীর জাতির সাথে মিশ্রিত হয়। এসময় নেগ্রিটো রক্তবাহী হাবশী ছাড়াও তুর্কী, আরবীয়,ইরানীয়, আফগান, মোঘল আর পাঠানরাও এ ভূ-খন্ডে সংমিশ্রিত হয়। আসে ইউরোপীয় জাতি গোষ্ঠী। তারারও নিজেদের আর্য বলে বিশ্বাস করত। তারা চালায় উপনিবেশিক শাসন। তাদের সাথেও আমাদের রক্তের মেলামেশা হয় হালকা ভাবে। আর এই ধরণের বহুরূপী সংমিশ্রণের মাধ্যমেই বিভিন্ন বৈশিষ্ট নিয়েই গড়ে উঠি আমরা। আমরা বাঙালীরা। তার পরের ইতিহাসগুলো সবারই কম বেশি জানা আছে।

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা সনের প্রথম দিন। আজ নববর্ষ। নতুন বর্ষকে বরণ করছি সবাই। উৎযাপন করছি মনের আনন্দে। আনন্দ আজ সবখানে। এসব আনন্দের মাঝেও দূঃখ আছে। আমাদের দেশে আগুন লাগাটা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে প্রিয় মানুষেরা। সড়ক দূঘটনার মত অনাকাঙ্খিত খবরে আনন্দ উদযাপনের শক্তি আর থাকেনা। যখন দেখি আমার প্রতিষ্ঠানেরই নবীন শিক্ষার্থী প্রাণ হারায় সড়ক দূর্ঘটনায়, তখন আর লিখতে মন চায়না। জীবনন্ত মানুষ থেকে জড় পদার্থ হয়ে যাই। নিশ্চই এই মৃত মানুষগুলোরও পরিকল্পনা ছিল আজকের এই দিনটি নিয়ে। হয়তো প্রিয়জনদের সাথে আনন্দঘন সময় কাটাবার স্বপ্ন দেখত তারাও।

উল্লিখিত দূর্ঘটনা এড়ানোর জন্য আমরা পারবোনা কোন সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে? কেন পারবোনা? একক বা ইউনিক সিদ্ধান্তে আসাটা আমাদের অতি জরুরী।  বিভক্তিযুক্ত রাজনৈতিক আদর্শে থেকে দেশের জন্য ইউনিক কোন সিদ্ধান্ত নেয়াটা মনে হচ্ছে খুবই কঠিন। এর কারণ কী?

বিঃদ্রঃ সংস্কৃত অর্থে আর্য শব্দের অর্থ হলো ’সৎ বংশজাত ব্যক্তি’। ইউরোপীয় পন্ডিতদের মতে আর্য হলো একটি ভাষার নাম। কিন্তু ভারতবর্ষে বহুকাল ধরে ’আর্য’শব্দটি জাতি বাচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 


নতুন বছর নতুন সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হলেও পরিতাপের বিষয়, আমাদের নতুন বছর শুরু হয়েছে তীব্র অস্থিরতা ও হিংসা-প্রতিহিংসার মধ্য দিয়ে। অবস্থার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সাধারণ জনগণ রয়েছে মারাত্মক দুর্ভোগে।যেখানে, পিতৃতুল্য একজন শিক্ষকের কাছেও তার ছাত্রী নিরাপদ নয়। যারা মানুষকে মূল্যবোধ আর ন্যায়নীতি শেখাবে। সেখানে তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাজা প্রাণ আগুনে বলি দিতে হয় ছোট মেয়ে  নুসরাতকে। প্লেটোর লেখায়  পড়েছিলাম, সক্রেটিসকে তাঁর প্রিয় শিষ্যরা বাঁচানোর জন্য বহু চেষ্টা করেছিল। প্লেটো, ফ্রিডো, কিটো তাকে পালিয়ে যেতে কাকুতি–মিনতি করেছিলেন নানাভাবে। তখন সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘মৃত্যুকে এড়ানো তত কঠিন নয়, যতটা কঠিন অসম্মানকে এড়ানো।’ছোট্ট মেয়ে নুসরাত সম্ভবত প্লেটোর লেখাটি পড়েনি। তবুও সে সক্রেটিসের মতো নিজেকে অসম্মানিত হতে দেয়নি। তাইতো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে করতে তীব্র ব্যথা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো মেয়েটি। ‘

লেখক :- মোঃ মাহফুজুর রহমান,প্রভাষক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,নোয়াখালী সরকারি কলেজ।