২১, আগস্ট, ২০২০, শুক্রবার | | ২ মুহররম ১৪৪২

জীবন: কচু পাতায় পানি (দ্বিতীয় পর্ব)

আপডেট: ডিসেম্বর ১০, ২০১৮

  • Facebook Share
জীবন: কচু পাতায় পানি (দ্বিতীয় পর্ব)

তালুকদার তুহিন (বিশ্বনাথ সরকারি কলেজ):

(উৎসর্গ করছি: সাজু, বাবু, তারিন, হুশী)

বাঁশি বাজানো শেখার চেষ্টায় আছি,দূরে কোথাও বাঁশির শব্দ শুনা যাচ্ছে,
“আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে,সাত সাগর আর তের নদীর পারে”
শুনেছি বাঁশি পৃথিবীর সেরা বাদ্যযন্ত্র। আচ্ছা, যারা বাঁশি বাজান তারা কি প্রকাশ করতে চান,কষ্ট,আবেগ নাকি ভালবাসা,কিছু একটা হবে নিশ্চই,কিছুদিন আগে উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় হাটছিলাম,এক রিকশাওয়ালা,ভাই বাশি বাজাচ্ছিল,আমি দাড়িয়ে পরলাম এবং শুনে বোঝার চেষ্টা করছিলাম,মনে হল অপরিচিত তবে দুঃখের কোন সুর। ছোট বেলায় পিতলের একটা বাঁশি নিয়ে খেলতে শুরু করেছিলাম,আম্মার কাছে প্রচন্ড বকা খেলাম,পরে আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম,বাঁশিটি কার,উনি বললেন,”তোর নানার”।আমি অবাক হয়ে বললাম,”নানা তো মাওলানা ছিলেন,উনিও কি বাশি বাজাতেন?”আম্মা বললেন,”হ্যারে,বাবা,এটি উনার শখ ছিল।”প্রসঙ্গত, আমার মা কিন্তু সুফী বংশের মেয়ে ছিলেন,উনিও আমার মত অনেককাল শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন।

বাবা যখন মারা গেলেন দাফনকার্জ শেষ হওয়ার পড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসার পরে মায়ের সামনে যাওয়ার ইচ্ছা বা সাহস ছিলনা।হাজার মানুষের ভীরে এক মহিলা সাদা শাড়ি পড়া অবস্হায় আমাকে জড়িয়ে ধরলেন,খুব অস্বস্তি হচ্ছিল,কে না কে? ভাল করে তাকিয়ে দেখি আমার মা,সম্ভবত ঐ সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ,কি বলব? যাকে সবসসময় দেখতাম বাবার সাথে ঝগড়া করতে,অভিমান করতে,তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা ছিলনা।

বাঁশি প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসছি।নানার ঐ বাঁশি আসলে কোন কাজে আসত না।কিন্তু নিশ্চিত অনেক স্মৃতি বিজড়িত।,মা যতটা যত্নে রেখেছেন এর পরের প্রজন্ম মানে আমরা কি পারব,অতটা যত্নে রাখতে।বাস্তবতা ভিন্ন।যার কাছে যে স্মৃতিটি গুরুত্বপূর্ন সে সেটি আকড়ে ধরে রাখতে চায়।একি জিনিষ অন্য কারো কাছে,অর্থহীন,হাস্যকর।মানুষ এর জীবন এমনি। কিছুদিন আগে ব্যক্তিগত জীবনে কিছু সমস্যা থেকে অনেকখানি বিষন্নতায় চলে গিয়েছিলাম।জীবন তখন অর্থহীন মনে হত,মনে হত স্হীর,সময় থমকে আছে।একদিন রাত ১২টায় মা চা নিয়ে এসে বললেন,”চল তোর সাথে আজকে সারারাত গল্প করব”।বুজতে পারছিলাম মা ছেলেকে মানসিকভাবে চাঙা রাখতে চাচ্ছেন।মাকে বললাম বাবার সাথে মজার কোন গল্প থাকলে বলতে।মা বললেন”বাবারে ভালবাসা সব যুগেই সমান।কেউ যদি কাউকে সত্যি ভালবাসে,তাহলে সেখানে আসলে অজুহাতের কোনন স্হান হয়না।তোর বাবার সাথে আমার খুব কম বয়সেই বিয়ে হয়েছিল এবং আমি উনাকে সারাজীবন ভালবেসে গেছি,বাবারে এমন তো নয়,যে আমাদের যুগেও খারাপ লোক কম ছিল।নিজে ঠিক থাকলে দুনিয়া ঠিক।তোদের যুগে মানুষ ফেইসবুক,ওয়াটস আপ এগুলোতে সুজোগ নেওয়ার চেষ্টায় থাকে।আর আমাদের সময় মানুষ চিঠি ছুড়ে মারত,বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকতো,সবকিছু নিজের কাছেরে বাবা।

আমি মাকে আবার অনুরোধ করলাম মজার কোন স্মৃতি থাকলে বলতে।মা বললেন,”তোর বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমাকে একদিন বললেন ফজরের নামাজের পর আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন। আমি তো অবাক বললাম,ছেলে জানতে পারলে অনেক লজ্জার হবে।”বাবা নাকি হাসলেন,”আমি খুব আস্তে আস্তে বের হয়ে আসলাম।”তোর বাবা আমার হাতে ধরলেন। তারপর বাসার পাশেই যে ব্রীজ সেখানে নিয়ে গেলেন। আগে থেকেই বাদাম কিনে রেখেছিলেন। মাকে দিলেন.. মা যখন আমাকে কথাগুলো বলছিলেন। তখন খুব লজ্জা পাচ্ছিলেন। শেষে নাকি বাবাই মাকে বললেন,”আমি আর বেশিদিন বাঁঁচব না।তোমাকে অনেকদিন একলা বেচে থাকতে হবে,একা থাকা অনেক কষ্টের হবে,তাই তোমাকে একটা স্মৃতি দিয়ে গেলাম,দেখলাম,মায়ের চোখে পানি।আমি মায়ের কোলে মাথা রাখলাম,উনি আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।আমি মাকে একটা গান শোনাতে চাইলাম, উনিও রাজি হলেন।

“সখি ভাবনা কাহারে বলে,
সখি যাতনা কাহারে বলে,
তোমরা যে বল দিবস-রজনী ভালবাসা ভালবাসা,
সখি ভালবাসা কারে কয়,
সে কি কেবলি যাতনা ময়।”

মা মনে হয় গানটা জানতেন না,তাও কাঁদছিলেন,আমিও।দুইজনের কষ্ট ভিন্ন। তবে কষ্ট তো কষ্টই। মা বললেন,”বাবারে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়না,এগুলা কিন্তু ভয়ঙ্কর,যার জন্য ফেলছিস। তার গায়ে ঠিকি লেগে যাবে। তুই যেভাবে ভাবছিস,অপর পাশের মানুষ অনেক সুখে আছে,ভুল ও তো হতে পারে রে বাবা।তুই যেভাবে দীর্ঘশ্বাস নিচ্ছিস,ঠিক সমানভাবে তাকেও ফেলতে হবে। দুইদিন আগে আর পরে।এটাই প্রকৃতির নিয়ম।ভালবাসলে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলতে নেই,লেগে যায়।”
কোন এক বড় ভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম,সাতার,সাইকেল আর ভালবাসা এগুলো নাকি কখনো পুরনো হয়না,ধুলো জন্মে,কিন্তু ফু দিলে যেমন ধুলো উড়ে যায়,ঠিক এগুলো ও দেখার সাথে সাথেই জেগে উঠে। হবে হয়তো!

মজার ব্যাপার হচ্ছে,বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স এর পর মানুষ একজনের সাথে আরেকজন দেখা করতে চায়না বা কথা বলতে চায়না,ব্যাপারটা একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে যা পাওয়া যায়,তা হচ্ছে দেখা হলে বা কথা বললে আবার দূর্বলতা তৈরী হবে। তখন বিচ্ছেদ আর ধরে রাখা যাবেনা। কঠিন কাজ,কিন্তু নিজের চোখেই দেখলাম,সম্ভব,বিচ্ছেদের পর প্রথম কাজ হচ্ছে মোবাইল থেকে ছবি মুছে দেওয়া,নাম্বার মুছে দেওয়া। নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখা। খুব নিষ্ঠুর এবং অবাক করা কাজ কিন্তু এটাই তো করতে হয়,তাই না?

আগের বছর মা ভাজ করা একটা পাঞ্জাবী এনে দিলেন, যেন এটা পড়ে ইদের নামাযে যাই। অবাক হলেও কোন প্রশ্ন করিনি।মা তাকিয়ে দেখছিলেন। হঠাৎ বুজতে পাড়লাম, এটা বাবার পাঞ্জাবী। ভালবাসা মরে যায়না।বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। সেই স্মৃতি আমার কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ন তার থেকে আমার মায়ের কাছে নিশ্চই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ন। ঠিক যেমনি আমার কাছে আমার ভালবাসার মানুষ এর সাথে কাটানো সময়গুলো যেমন অনেক গুরুত্বপূর্ন,অনেক স্মৃতির। খুব ছোটবেলা খুব নাদুসনুদুস ছিলাম দেখতে,মানুষ সুযোগ পেলেই গালে মোচড় দিয়ে বলতো ‘গুলটুস’। একবার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম, একটা দোকানে বসে দেখছিলাম, কোন একটা বাচ্চা কেরোসিন তেলের একটা বোতল ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। আমি দাড়িয়ে হাসছিলাম। হঠাৎ এক ১৭/১৮ বছরের ছেলে এসে আমাকে একটা থাপ্পড় মেড়ে গালে ৫ আঙুলের দাগ বসিয়ে দিল। ভয়ে ৭ দিন জ্বরে ভোগলাম। ভাবলাম বড় হয়ে আমিও বাচ্চাদের থাপ্পড় দিব,কিন্তু সত্যি হচ্ছে পারিনি। কারণ,আমি বাচ্চাদের খুব ভালবাসি। এইগল্পটা একজনকেই বলেছিলাম, এখন জনসমক্ষে বললাম।মা দিন কে দিন বুড়িয়ে যাচ্ছেন। লক্ষণ ভালো নয়! আমি মাকেও অনেক ভালবাসি।

বাশি বাজাতে ইচ্ছা হচ্ছে…. “আমার মত কে আর সুখী, আয় সুখী আয় আমার কাছে… সখি ভালবাসা কারে কয়,সে কি কেবলি যাতনাময়।