৫, জুন, ২০২০, শুক্রবার | | ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: করোনার ছোবলে তারুণ্যে মানসিক চাপ!

আপডেট: মে ১৫, ২০২০

  • Facebook Share
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: করোনার ছোবলে তারুণ্যে মানসিক চাপ!

শুরুতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দুইজন ছাত্রের ফেইসবুক স্ট্যাটাস পড়ি চলুন…
১.বুরো মৌসুমের বাম্পার ফলন হয়েছে এবছর। তারপরও কৃষকদের মনে স্বস্তি নেই। বৈশ্বিক করোনা মহামারীতে লকডাউনে পুরো দেশ। ফসল ঘরে তুলতে মিলছে না কোন দিনমজুর। আমি গৃহবন্দী অবস্থায় শহরেই আছি। মন পুরো উচাটন। যখন-তখন মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠেই সকালের আকাশ দেখা, সন্ধ্যের আড্ডা সবকিছুর  ভীষণ অভাব বোধ করছি। প্রচুর সময় আছে কিন্তু সঙ্গী নাই। শুধু একটা ঘরে বিচারাধীন আসামীর মতো ফাঁসির রায় অথবা মুক্তির প্রতিক্ষায়!  করোনা কবে মুক্তি দিবে কিংবা কবেই বা প্রাণনাশ করবে কিচ্ছু জানি না। ক্লান্ত হয়ে আনমনে ঘর থেকে বের হতে যাবার সময় মনে হয় এই শহর এখন ফাঁকা। সবাই বাড়ি চলে গেছে। যার কথা যখন মনে হয় ফোন করে খবর নিচ্ছি। গতকাল একটা জুনিয়রকে ফোন দিলাম, “কিরে, কেমন আছিস?” সে কণ্ঠস্বর ভারী করে উত্তর দিল, “ভাই, চলতি মাসের ১৮ বা ১৯ তারিখ সেমিস্টার ফাইনাল বুঝতেই তো পারতাছো অবস্থা।” আমি ভাবছিলাম পরীক্ষার আগে প্রস্তুতিমূলক সমস্যায় ভুগছে হয়ত। সাথে সাথে সে বলে উঠলো, “ক্ষেতে ধান পাকছে ভাই, রোজের কামলা মিলতাছে না। ধান কাটতে যাইমু আব্বার সাথে। আব্বার মুখে চাওয়া যায় না। তার উপরে ফাইনালের আগে সেমিস্টার ফি দিতে হয়। তুমিই কও কেমনে কই আব্বারে?
পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেই যে সকল বাবা অনেককিছু অপূর্ণ রেখে সন্তানের সেমিস্টার ফি দেন, এই করোনা কালীন অবস্থায় তারা কেমনে ফি দিবে? আমরা তো আমাদের সামনে বাবাকে ছোট মাথায় কখনোই দেখি নাই। বড্ড খারাপ লাগে।

২.ক্যান্টিনের আবুল ভাইকে ফোন দিলাম, ” ভাই, কেমন আছেন?” থমকে গিয়ে উত্তর করলেন, “কে? অহ, ভাই! অবস্থা তো খারাপ ভাই। আপনাদের দেখা নাই। আপনাদের দেখা না হলে কি খোরাক মিলে?” বেচারার কথাটা ফেলে দেবার দুঃসাহস আমার নাই। উনি চা-সিঙ্গারা খাওয়ানোর পর সরাসরি উনার হাতেই টাকাটা দেই। অথচ জ্ঞান যেমন দেখা যায় না তেমনি একটা পরোক্ষ আর্থিক সম্পর্ক শিক্ষকের সাথে ছাত্রছাত্রীদের। যা কখনোই সামনে আসে নাই। কিছুদিন আগে খবরে যখন শুনি আমাদের প্রদানকৃত অর্থেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা জীবনযাপন করেন তখন খুব খারাপ লাগে। ঘরে বাবার পকেট ফাঁকা, মুখ কালো মায়ের আর টিভিতে শিক্ষকের বেবীর দুধ না কিনতে পারার যন্ত্রণা মস্তকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন উপায় নেই? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনলক্ষ শিক্ষার্থী কী জাতির বোঝা? মানসিক প্রশান্তির জন্য যে সকল প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে তাঁরা তো আমাদেরই কারো বাবা, কারো ভাই। অথচ ঘরের ভেতরে আমরা মরছি মানসিক যন্ত্রণায়! 

৩.বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অসংখ্য প্রশ্নগুলোর দুইটা প্রশ্ন উপরে পড়েছেন। তিনলক্ষ ছাত্রছাত্রীর সবাই যে এরকম অবস্থায় আছে, তা নয়। তবে, অনেকেরই অবস্থা প্রায় এমন। যে শিক্ষার্থীর বাবা ব্যবসায়ী, সে পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবে? সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখতে গিয়ে অনেকেই বলতে পারছে না। দিন দিন করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। কবে স্বাভাবিক হবে নিশ্চয়তা নেই। এই পরিস্থিতিতে যাদের হাতে কিছু অর্থ আছে তারাও বাধ্য না হলে হাত খালি করতে চাইবে না। তার উপর রমজান মাস। মধ্যবিত্তদের হাড়ির খবর যারা রাখেন তাদের সবই জানা। 
তিনলক্ষ শিক্ষার্থীর মাথার উপর থেকে বোঝাটা কোনভাবেই সরানো সম্ভব নয়! সন্তানের সামনে বাবাকে আর কত ছোট হতে দেখবে তারা? ক্রান্তিকালীন সময়ে তিনলক্ষ তরুণ তরুণীর মানসিক চাপমুক্তি প্রদান সমাজের শিক্ষাবিদ, মনোবিদ, রাজনীতিবিদ সকলের অন্যতম দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনে আপনারা ব্যর্থ হবেন না বলে আশাবাদী। তারা মানসিক ভাঙন থেকে মুক্ত হলে শিক্ষার মৌলিক বিপর্যয় দূর হবে। ইউজিসি, সরকার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ দায়িত্বশীল আচরণ করুন।

লেখক: এম. এ. সিদ্দিকী বাপ্পীকবি ও লেখক