২৩, আগস্ট, ২০২০, রোববার | | ৪ মুহররম ১৪৪২

শিক্ষাব্যবস্থা ও আমাদের অবস্থান

আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০১৮

  • Facebook Share
শিক্ষাব্যবস্থা ও আমাদের অবস্থান
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, সেই মেরুদণ্ড এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত! নড়বড়ে ও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে । দেশে শিক্ষা পদ্ধতি আর শিক্ষানীতি নিয়ে বিতর্ক বেশ।
শিক্ষার মান ও সার্বিক অবস্থা নিয়ে অনেকেই বেশ উদ্বিগ্ন। তাদের মতে সুশিক্ষা অর্জিত  না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কখনোই আসতে পারে না। নানা বিভেদ, বিভাজনের বিষে জর্জরিত হয়ে গেছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশীয় শিক্ষার মান উন্নয়ন করতেই নাকি গ্রেডিং পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা হোক। কিন্তু এই বিষয়ে বাস্তবে কী করা হলো? কী করা হচ্ছে! রাষ্ট্রপতি নিজেও দেশের এই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার বেহাল দশায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন।
গ্রেডিং পদ্ধতিতে জিপিএ’র জোয়ার বইতে শুরু করেছে। প্রতিটি বোর্ডে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। এমন আন্তর্জাতিক মানেও সন্তুষ্ট হতে পারলো না দেশ! পাসের হার বৃদ্ধি করতে হবে। শুরু হয়ে গেলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাসের হার নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা। অসুস্থ এই প্রতিযোগিতার বলি হতে শুরু করলো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ও শিক্ষার্থীরা।
খোদ শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই এবং অনেক বেকার যুবক শিক্ষার নামে কোচিং ব্যবসা শুরু করলেন। পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থী ধরা শুরু হলো। কোচিংয়ে কতিপয় অসাধু শিক্ষক ও কিছু অসাধু চক্র প্রশ্ন ফাঁস করে দিতে শুরু করেন। ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়লো দেশজুড়ে প্রশ্ন ফাঁস ও তার আতঙ্ক।
পরীক্ষার আগেই ফেসবুক, ভাইবার ও হোয়াটস অ্যাপে প্রশ্ন বিক্রি শুরু হয়। বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীরাও গণহারে জিপিএ-৫ পেতে শুরু করে। পরীক্ষার পর পাসের হার বৃদ্ধির জন্য উত্তরপত্র মূল্যায়নকারী শিক্ষকদের জানিয়ে দেওয়া হয়, যাই লিখবে তাতেই নম্বর দিতে হবে।
ফল হল এই যে, আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে মানের শিক্ষার্থী পাওয়া যেত এখন সেই গুণগত মানের শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে গণহারে অকৃতকার্যও হয়।
মহামান্য রাস্ট্রপতি আব্দুল হামিদ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রশ্নফাঁস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্দ্যেশ্যে বলেছেন,‘আমি বুঝি না এ কেমন শিক্ষক যে ছাত্র-ছাত্রীদের নকল সরবরাহ করে। মা-বাবারাই বা কেমন যারা নিজেরাই নিজেদের সন্তানদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।‘
নিয়োগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে সব পরীক্ষায় এই প্রশ্নফাঁস এক কঠিন ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।  সম্প্রতি অনেকে এই ব্যধির প্রতিকার নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও নিবিড় প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেশে সুশিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।
দেশে একটি বা একাধিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষকদের মধ্যে বুনিয়াদী, কার্যকর ও আধুনিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার এক নতুন চিন্তা সরকার নিতে পারে। যেখানে যেন আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এক অগ্রণী চিন্তায় আমার পৃথিবী উদ্ভাসিত হয় আমার জ্ঞানের আলোকে! এই শিক্ষা হবে আমাদের উপার্জনের হাতিয়ার।
দেশে এমন অবস্থা যেখানে উচ্চশিক্ষিত হতে যত বছর সময় লাগছে চাকরি পেতে সেই ছাত্রকে এর চেয়েও বেশি সময় অপচয় করতে হচ্ছে!
বর্তমান বিশ্বে চলছে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং গোটা বিশ্বের শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে এখন আজীবন চাকরি বলে কিছু নেই, চাকরি আছে ততদিন যতদিন কাজ আছে এবং কাজ আছে ততদিন যতদিন চাহিদা আছে।
 শিক্ষা ও শিক্ষার মান নির্ভর করছে গ্লোবাল চাহিদার উপর এবং তাও হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট লেভেলে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিত করে বলা কঠিন কী পড়লে সারা জীবন চাকরির গ্যারান্টি মিলবে। তবে সারাজীবন টেকসই ইন্ডাস্ট্রি প্রোভাইডার এবং যোগ্য নাগরিক হিসাবে বেঁচে থাকতে হলে দরকার সময়োপযোগী সুশিক্ষা।
শিক্ষকদের সুশিক্ষার আওতায় আনতে এবং তা বাস্তবয়ন করতে হলে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই।
দেশের সব শিশু শিক্ষা বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব স্তরের শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান ও গ্রহনের একটি সমন্বিত কার্যক্রমের আওতায় থাকবে। যেখানে দেশ, বিদেশের বড় বড় কম্পানি বা সংস্থার মালিক বা সিইও , কর্মকর্তা , গবেষক, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা একত্রিত হয়ে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষকদের পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি ও যুগোপযোগীকরণে সহায়তা দান করা এবং শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি জাগ্রত করা, নতুন নতুন শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষতা ও কৌশল বৃদ্ধি করা হবে এই বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য।
এমতাবস্থায় শিশু শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত নিবিড় নজরদারী চালু রাখতে হবে। কী শিক্ষা, কেন শিক্ষা, শিক্ষার উদ্দেশ্য কী এবং তা কীভাবে মনিটরিং করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। শিশুদের ১-১৫ বছর বয়সের মধ্যের সময়টা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরে পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলতে হবে সুশিক্ষার সার্বিক অবকাঠামো। যেখানে থাকতে হবে জানার থেকে শেখা। দুর্নীতি বা অনিয়ম যেন কলুষিত করতে না পারে শিক্ষা প্রশাসনকে, শিক্ষাঙ্গণকে।
গতানুগতিক, অসম্পূর্ণ, সনদপত্রসর্বস্ব, তত্ত্বীয় বিদ্যাপ্রধান, অপর্যাপ্ত ব্যবহারিক শিক্ষা, মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল এবং পুরনো পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসারী, তাই আশানুরূপ ফল লাভ হচ্ছে না।
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার যে,বাংলাদেশে সুশিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ পরবর্তী ফলোআপ খুবই জরুরি।
দেশে তার জন্য পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রাইমারী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আলাদা আলাদা ভাবে কিছু শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেগুলো মানসম্পন্ন শিক্ষা বিস্তারে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
আবার শিশু বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরের শিক্ষকদের জন্যও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে দেশে দিনে দিনে শিক্ষিতের হার বাড়লেও বাড়ছে না শিক্ষার মান।
বর্তমান যে সব বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা জানে না কি ধরনের শিক্ষা দেওয়া দরকার একজন শিশু বিদ্যালয়ের শিক্ষককে। পুরো শিক্ষাঙ্গন খুঁজলে পাওয়া যাবে খুব কম সংখ্যক এইসব গুণসম্পন্ন শিক্ষক, নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। মানুষের মত দেখতে হলেই মানুষ গড়ার কারিগর হওয়া যায় না, তার জন্য দরকার মিশন , ভিশন এবং পলেসি। সঙ্গে ডেডিকেশন, প্যাশন, মোটিভেশন, গোলস এবং অবজেকটিভস। শিক্ষামন্ত্রনালয়ের রদবদল করতে হবে প্রথমে এবং জনগনের মনোনীত প্রার্থী ও স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে এ কাজ শুরু করতে হবে।
দেশের শিক্ষাঙ্গনের এই দুর্দিনে সামরিক বাহিনী পরিচালিত ক্যাডেট কলেজগুলো থেকে আমরা তাদের প্লানিং টুল ফর এ্যাডমিনিসট্রেশন, ডিসিপ্লিন, সোর্স ইন্টিগ্রেশন, সিনক্রোনাইজেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি।
জ্ঞানদান যেন এমন হয় যে সব কিছু জানার মাধ্যমে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সবাই শিক্ষার বিষয়টি দেখছে, জানছে, জল্পনা-কল্পনা করছে কিন্তু কীভাবে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন করা যায় তা নিয়ে খুব কমই কথা হচ্ছে। এখনোও চলছে সেই সনাতন শিক্ষাদান পদ্ধতি যা বয়ে আনছে দেশে শুধু অন্ধকার ও বেকারত্ব। আজ জাতি সত্যিকারের শিক্ষা হারিয়ে ফেলছে।
সুশিক্ষা, মানসম্মত শিক্ষার অভাবে যে সামান্য সুযোগ সুবিধা দেশে রয়েছে তার দিকে চেয়ে আছে লাখ লাখ বেকার যুবক। চাকরিতে লোক নিয়োগ হবে একজন, হাজার প্রার্থী তাতে আবেদন করছে। ‘কোটা’ থাকা সত্ত্বেও হবে কি চাকরি সবার? যারা চাকরি পাবে না তাদের কর্মসংস্থানের জন্য কী ভাবা হচ্ছে?
 দেশে লাখ লাখ বেকার তৈরির এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কি কোনো জবাবদিহিতা আছে? সরকারের কী বক্তব্য এই ব্যপারে?
লেখকঃ প্রভাষক, ইংরেজী
গুনজর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা
মুরাদনগর,কুমিল্লা।